সাতকানিয়ার স্কুলে ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

রতন দাশ, সাতকানিয়া প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাসিরাবাদ শাখার ব্যাবস্থাপক মো. নাসির উদ্দিন ও প্রধান শিক্ষক সুনীল কুমারের বিরুদ্ধে বিদ্যালয় তহবিলের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ দাখিল করেছেন পরিচালনা কমিটির নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য ও শিক্ষানুরাগী সদস্যসহ চারজন।

গত ১ মার্চ অভিযোগ দাখিলের পর ২৩ মার্চ দুই সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন শিক্ষাবোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক মোহাম্মদ হালিম এবং সহকারী সচিব মো. সাইফুদ্দিন। জানা গেছে, শিক্ষাবোর্ডে অভিযোগ দাখিলের তথ্য জেনে ক্ষিপ্ত হন বিদ্যালয় সভাপতি নাসির উদ্দিন। অভিযোগকারীদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি হুংকার ছেড়ে বলেছেন, আমি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে চাকরি করি, টাকার সমস্যা নেই।

টাকা দিলে বোর্ড ম্যানেজ করা কোনো বিষয় নয়। আর অভিযোগকারীদের জানা উচিত ছিল, আমি জিয়াউল হক চেয়ারম্যানের ছেলে। ১৯৮৮ সালের ইউপি নির্বাচনের সময়ের রূপ তাদের স্মরণ রাখা উচিত ছিল। প্রসঙ্গত, ওই সময়ের ইউপি নির্বাচনের দিন তৎকালীন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এজিএম শাহজাহানের সমর্থক কাজী লিয়াকত আলীকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলিবিদ্ধ হন মিয়া নামের এক বৃদ্ধ। গুলিবিদ্ধ মিয়া এখনও জীবিত আছেন। তবে ওই ঘটনার বিচার পাননি তিনি। এদিকে শিক্ষাবোর্ডে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ‘খাতওয়ারি আয়, খাতওয়ারি ব্যয়’ নিশ্চিত না করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোচিংয়ের নামে বিশেষ ফি ও জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে ২০১৬-২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৪ লাখ টাকা কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রধান শিক্ষক সুনীল কুমার ফেসবুকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুবর রহমানের জন্মবার্ষিকী নিয়ে চরম আপত্তিজনক মন্তব্য করেন উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ১৭ মার্চ তিনি ফেসবুকে দেওয়া পোস্ট লিখেছিলেন ‘জন্মদিন ও জাতীয় দিবস পালন প্রসঙ্গে আজ সব সরকারি অফিস আদালত বন্ধ। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা। মাষ্টাররা কাজ করবে, বাকিরা মজা করবে এটা মেনে নেওয়া যাইনা। আমি সম্পূর্ণ এর বিরোধী। করলে সবাই পালন করবে না করলে কেউ করবেনা। তাছাড়া কেউ মরার পর জন্মদিন পালন করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। আর এ সমস্ত দিবসগুলি বন্ধের তালিকাই দেওয়ার দরকার কি ছিল। যতসব রাবিশ।’ অভিযোগে বলা হয়, এমন আপত্তিকর প্রচারণার পরও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সাহস দেখাননি মূলত অর্থ-আত্মসাতের সহযোগী হওয়ার কারণে। এ বিষয়ে অভিভাবক সদস্য আহমদ কবির বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের এমন গর্হিত প্রচারণায় গ্রামে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই ম্যানেজিং কমিটির মিটিংয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব করি। কিন্তু এতে সভাপতি রাজি হননি।

উল্টো প্রধান শিক্ষককে রক্ষা করেন।’ অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয় তহবিল থেকে কৌশলে আত্মসাতের টাকায় পাবর্ত্য জেলা বান্দরবান সদরে আবাসন কম্পানির সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। এছাড়া চকরিয়ার পাহাড়ি এলাকা একটি বৃহৎ খামার গড়ে তুলেছেন। অভিযোগে সভাপতি-প্রধান শিক্ষকের দহরম-মহরম সম্পর্কের নেপথ্যে আর্থিক দুর্নীতি জড়িত এবং প্রধান শিক্ষক অদক্ষ উল্লেখ করে বলা হয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপানো ডায়েরিতে একটি বাণী প্রকাশ করেন প্রধান শিক্ষক। মাত্র ৮২ শব্দের সেই বাণীতে বাংলা বানান ভুল করেছেন ১১টি। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই বিদ্যালয় কমিটির রেজুলেশনে অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিশেষ কোচিং ফি বাবদ মাসিক ৩০০ টাকা হারে আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে চার বছরে কোচিং ফি আদায় হলেও বিদ্যালয় তহবিলে বিধি মোতাবেক এক পয়সাও জমা হয়নি। এইখাতে প্রায় ১২ লাখ টাকা আত্মসাত হয়েছে।

এছাড়া বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ফরম বিক্রির অর্থও নয়-ছয় হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের সভায় অভিভাবক সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি নিয়ে পর্যালোচনা উপ-কমিটি গঠিত করার সিদ্ধান্ত হয়। পর্যালোচনা শেষে উপ-কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে আর্থিক অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য ২০০৮ সাল থেকে অদ্যাবধি বিদ্যালয়ের অডিট না হওয়া, ২০১৬ সালের অডিট করার পরও আপত্তি নিষ্পত্তি না করে সেটি ধামাচাপা দেওয়া এবং প্রায় ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্যাদি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বিশেষ কোচিংয়ে চার বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা, আদায়কৃত জরিমানার এক লাখ ৯৩ হাজার টাকা, ‘মিলাদ’ ও ‘দরিদ্র ভাতা’র টাকা আত্মসাৎ, সরকারিভাবে শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাওয়ার পরও দ্বিতীয় দফায় বিদ্যালয় তহবিল থেকে ‘বেতন’ পরিশোধ দেখিয়ে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা করে চার বছরে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতসহ চার বছরে অন্তত ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে আসে।

কিন্তু সুনীল কুমার ও নাসির উদ্দিন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নিয়মিত মিটিংয়ে প্রতিবেদন উত্থাপন না করে বিষয়টি ধামাচাপা দেন। অভিযোগ আছে, ভবিষ্যতেও সভাপতি নির্বাচিত হতে শিক্ষক প্রতিনিধিগণ তিনটি ভোট নাসির উদ্দিনের পক্ষে প্রয়োগ করবেন— এমন মৌখিক নিশ্চয়তা দিয়ে পর্যালোচনা প্রতিবেদন হিমাগারে পাঠান সুনীল কুমার। বিদ্যালয়ের নানা অনিয়মের বিষয়ে নিয়মিত কমিটিতে প্রতিকার করতে না পেরে শিক্ষাবোর্ডে গত ১ মার্চ লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন পরিচালনা পরিষদের নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য কাজী মহিউদ্দিন, আহমদ কবির, জাহাঙ্গীর আলম ও শিক্ষানুরাগী সদস্য জামাল হোসেন। শিক্ষাবোর্ড নির্ধারিত তিন হাজার টাকা ফি সরকারি কোষাগারে জমা সাপেক্ষে লিখিত অভিযোগ দাখিল করার পর শিক্ষাবোর্ড তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে তদন্ত শুরু করেনি ওই কমিটি।