সরাইলে নাম খারিজের দাবীতে মানববন্ধন; সমঝোতার প্রস্তাব ইউএনও’র

মুরাদ খান, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি: সিটিজেন চার্টারে ৪৫ কার্য দিবসের মধ্যে জায়গার নাম খারিজের আবেদনের নিস্পত্তি করার কথা। কিন্তু সরাইলে ৬ মাস/ বছর দিন ঘুরেও সমাধান পাচ্ছেন না অনেকে। ফলে সহকারি কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে আবেদনের স্তুপ জমে আছে। এমন দীর্ঘসূত্রিতায় সীমাহীন সমস্যায় ভুগছেন জায়গা জমির মালিকরা। এরই প্রতিবাদে বুধবার সকালে সরাইল উপজেলা চত্বরে ভূমি অফিস কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে যায় ভুক্তভোগিরা। ঘটনাস্থলে এসে ইউএনও দিয়েছেন সমঝোতার প্রস্তাব। আশ্বাস দিয়েছেন দ্রুত সমস্যা সমাধানের। মানববন্ধনে অংশ গ্রহনকারী ভুক্তভোগিরা জানায়, গত এক-দেড় বছর ধরে নাম খারিজের আবেদনের নিস্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা সরাইলের অতীতের সকল রেকর্ডকে পেছনে ফেলেছে। সরাইলে গত দেড় বছরেরও অধিক সময় ধরে খারিজে ধীরগতি।

মাঝখানে ২ মাস একেবারে বন্ধ ছিল। ফলে আটকে গেছে জায়গা জমি ক্রয়-বিক্রয়। মানুষের অনেক সমস্যা হচ্ছে। ঋণ পরিশোধ, জরূরী চিকিৎসা, বিদেশ যাওয়া, বিয়ে-শাদী, ছেলে মেয়ের স্কুলের বেতন প্রদান ও ব্যবসা-বাণিজ্য আটকে যাচ্ছে। টাকার অভাবে অনেক কৃষকে মহাজনী সুদে ইরি বোরো ধান চাষ করতে হচ্ছে। মানববন্ধনে অংশ নেয়া ভুক্তভোগি মো. মোস্তাক আহমেদ (৬০) বলেন, আমি হৃদ রোগে ভুগছি। চিকিৎসার জন্য জায়গা বিক্রি করব। ২০২০ সালের ১ জুলাই সাড়ে দশ শতক জায়গা নাম খারিজের আবেদন করি। সদর ইউনিয়ন উপ-সহকারি ভূমি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরকে ৮ হাজার টাকা দেয়।

এরপরও নানা তালবাহানা করে ৩-৪ মাস ঘুরিয়ে টাকা ফেরৎ দেন। আমি ০৭.০১.২০২১ খ্রিষ্টাব্দে পরিত্রাণ চেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে আবেদন করি। এখন পর্যন্ত সমাধান পায়নি। কুট্রাপাড়া গ্রামের বাসিন্ধা কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি দেবদাস সিংহ রায় বলেন, খারিজে বিলম্ব হচ্ছে। জানতে উনার দফতরে যাওয়ার পর আমাকে ধমকাতে শুরূ করলেন। শুধু কাজে ধীরগতি নয়। উনার (এসিল্যান্ড’র) ব্যবহারও খারাপ। সরাইল সদর ইউনিয়নের উচালিয়া পাড়ার আবু তাহেরের ছেলে প্রবাসী আব্দুল জব্বার (৩৫)। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ৩ শতক ভিটে বাড়ি খতিয়ান থেকে নাম খারিজের আবেদন করেছিলেন। মোকদ্দমা নম্বর-৫৫/২০২০। ৩ মাস ঘুরে ওই আবেদনের কোন ফয়সালা পাননি তিনি।

অবশেষে চলে গেছেন কর্মস্থলে। জব্বারের আপন বড় বোন হারিফা বেগম (৪০) গত বছরের ২২ ডিসেম্বর এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। গত কোরবাণীর ঈদের আগে নাম খারিজের আবেদন করে আদৌ কোন সমাধান পাননি টিঘর গ্রামের গেদু মিয়ার ছেলে দিলু মিয়া (৫৫)। মোকদ্দমা নম্বর-৪৬/২০২০। গত ২৮ ডিসেম্বর তিনি এ বিষয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। আবেদনের ৫ মাস পর খারিজ না পেয়ে মৌখিক ভাবে নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছেন কালিকচ্ছ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য অরবিন্দ।

সরাইল সদরের আলীনগর গ্রামের সৈয়দ মোস্তফা নোমান গংরা ৫৭ শতক নাল ভূমির নাম খারিজের আবেদন করেন ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। মোকদ্দমা নম্বর-১৮৬৯/১৯-২০। ৪ মাস পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জায়গাটি পরিদর্শন করেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা মো. আশিকুল ইসলাম। এরপরও আটকে থাকে ফাইল। পরে তৎকালীন সার্ভেয়ার মো. কবির মিয়া (বর্তমানে আশুগঞ্জে কর্মরত) জানিয়ে দেন সহকারি কমিশনার (ভূমি) সরজমিনে পরিদর্শন করবেন। ১৬ মাস পেরিয়ে গেছে। আজও কোন নিস্পত্তি হয়নি ওই আবেদনের। এসব কারণে ফুঁসে ওঠে ভুক্তভোগিরা। বুধবার সকালে ২০-৩০ জন ভুক্তভোগি নাম খারিজের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে পরিত্রাণের দাবীতে উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়ায়। মূহুর্তের মধ্যে মানববন্ধন স্থলে আসেন ইউএনও মো. আরিফুল হক মৃদুল।

তিনি অংশ গ্রহনকারীদের মানববন্ধন না করে বিষয়টির উপর সমঝোতার প্রস্তাব দেন। সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অফিস কক্ষে বসে সমঝোতা সভা। সভায় উপস্থিত ছিলেন- ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার, থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা এস আই মো. জাকির হোসেন খন্দকার, যুবলীগের সাবেক আহবায়ক মো. মাহফুজ আলী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন, উপজেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা দেবদাস সিংহ রায় ও হৃদয়ে সরাইল সংগঠনের সভাপতি ফয়সাল আহমেদ মৃধা দুলাল। ভুক্তভোগিরা তাদের অভিযোগ গুলো তুলে ধরেন।

নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুল হক মৃদুল খারিজের আবেদনের বিভিন্ন ক্রুটি তুলে ধরেন। সেই সাথে সঠিকভাবে আবেদন করার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, সহস্রাধিক আবেদন ঝুলে আছে এমনটা আমার জানা নেই। কয়েকজনের মোকাদ্দম নম্বর নিয়েছি। নিস্পত্তি করে দিব। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্যান্য ভুক্তভোগি লোকজনের সমস্যা সমাধানেরও আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে তিনি ভুক্তভোগি লোকজনকে মানববন্ধন না করার আহবান জানান।