শীতের আগমনে রাণীনগরে খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি

সুকুমল কুমার প্রামানিক, রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: বৈচিত্র্যপূর্ণ ছয় ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এক একটি ঋতুর রয়েছে এক এক রকমের বৈশিষ্ট্য। তেমনি এক ঋতু হেমন্ত। এই ঋতুতেই দেখা মিলে শীতের। এই শীতের সময়ই শুধু পাওয়া যায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুর গাছের রস। শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে মিষ্টি সুস্বাদু এই খেজুর রস খাওয়ার মজাই আলাদা বলে মনে করছেন গ্রামের অনেক মানুষ। আর এই শীতের আগমনেই নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় খেজুর গাছের রস সংগ্রহের প্রস্ততিতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন গাছিরা। বর্তমানে এই পেশার ওপর অনেক মানুষ নির্ভরশীল।

তাই ব্যস্ত সময় পার করছেন খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্ততিতে গাছিরা। তবে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় খেজুর গাছের রসের ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। জানা যায়, এক সময় রাণীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর খেজুর গাছ ছিলো। বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। শীতের আগমনেই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্ততি নেন গাছিরা। বর্তমানে খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্ততিতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন এই উপজেলার গাছিরা। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে হলে প্রথমে খেজুর গাছের মাথার অংশকে ভালো করে পরিস্কার করার কাজ করতে হয়। এরপর পরিস্কার করা সেই সাদা অংশ থেকে বিশেষ কায়দায় ছোট-বড় কলসি মাটির পাত্র দিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়।

ছোট বড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই গাছিদের কোমরে মোটা রশি (দড়ি) বেঁধে গাছে ঝুলে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ করতে হয়। গাছিরা প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিস্কার করে ছোট-বড় কলসি (মাটির পাত্র) বাঁধে রসের জন্য। আবার সকাল অনুমান ৫ টা থেকে ৬ টার মধ্যে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে নিয়ে যায় তাদের নির্দিষ্ট স্থানে। কেউ কেউ কাঁচা এই রস এলাকার বিভিন্ন স্থানে ও হাটে-বাজারে খাওয়ার জন্য বিক্রয় করে আবার কেউ কেউ সকালেই এই রস দিয়ে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করার কাজ শুরু করেন। আরো জানা যায়, গ্রামের অনেকে মানুষ শীতের সকালে সুস্বাদু এই খেজুর রস ও খেজুর রসের তৈরি গুড় নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকে। এই খেজুর রসের তৈরি বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড় নিজ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে চালান হয় জেলা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। যা দিয়ে তৈরি হয় মুখোরোচক খাবার পায়েস ও হরেক রকমের লোভনীয় পিঠা। এটা বাঙালীর হাজার বছরের সংস্কৃতির একটি অংশ। তাই শীতের আগমনেই খেজুর গাছের রস সংগ্রহের প্রস্ততিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। উপজেলার মিরাজ আলী, আলতাব হোসেন, হাসান আলীসহ আরো অনেক গাছিরা জানান, শীত মৌসুমের শুরুতেই আমরা খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ করে থাকি।

বছরের এই শীত মৌসুমেই কয়েক মাস আমরা খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করে থাকি। এই রস থেকে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। তারা আরো জানান, বর্তমানে যে হারে খেজুর গাছ হারিয়ে যেতে বসেছে এক সময় হয়তো আমাদের এলাকা থেকে খেজুর গাছ হারিয়ে যাবে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাইলে আমাদের সবার উচিত তালগাছের মতো বেশি করে খেজুর গাছ লাগানো এবং তা যত্ন সহকারে বড় করা। যদি আমরা আমাদের এই হাজার বছরের ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে চাই তাহলে এই কাজে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছেন তারা। রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুর গাছের রস। শীত মৌসুম আসার সাথে সাথে রস সংগ্রহের প্রস্ততিতে ব্যস্ত থাকেন দক্ষ গাছিরা। গাছিদের খেজুর গাছ কাটার কাজটি শিল্প আর দক্ষতায় ভরা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌশল, রয়েছে ধৈর্য। খেজুর রস থেকে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করে থাকেন গাছিরা।