শরণখোলায় মিলন তান্ডবে গ্রাম ছাড়া কয়েকটি পরিবার

মাহফুজুর রহমান বাপ্পী, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : সাবেক গ্রাম পুলিশ সামাদ হাওলাদারের আট ছেলের মধ্যে মিলন (৩৮), নেহরুল (৪২), মনির (৪০), ছগির (৪৭) ও নজরুল (৪৫) এই পাঁচ ভাই সংগঠিত হয়ে গড়ে তুলেছে মিলন বাহিনী। নিরিহ গ্রামবাসীর উপর অত্যাচার, চাঁদাবাজি, জমিদখল, দস্যুতা, চুরিসহ নানা অপরাধমুলক কর্মকান্ডই তাদের পেশা।

বাগেরহাটের শরণখোলার পশ্চিম রাজাপুর গ্রামের ওই বাহিনীর অত্যাচারে অনেক পরিবার এখন গ্রাম ছাড়া। এসব অভিযোগের খবর পেয়ে গত শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় গ্রামবাসীর সাথে। সাংবাদিকদের পেয়ে একত্রিত হয় গ্রামবাসী। এসময় তারা দীর্ঘদিনের নিপিড়ন আর অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করেন। প্রবাসী সাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী ফাতিমা বেগম জানান, স্বামী প্রবাসে থাকায় তার ১২ বিঘা জমি জবর দখল করে নেয় মিলন বাহিনী। তার ছেলে মুসা (৮) রাস্তায় বের হলেই ভয় দেখায় ফলে দুই বছর ধরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ। অবশেষে ছেলেকে বাঁচাতে ১০ কিঃমিঃ দুরে উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় বোনের বাড়ীতে রাখতে হচ্ছে। এছাড়া গত ১২ মে তার কাছ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি মোবাইল সেট, স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নিয়ে যায় মিলন বাহীনি। এ বিষয়ে তিনি মামলা করলে তা প্রত্যাহারের জন্য নিয়মিত হুমকি দিচ্ছে।

এছাড়া রাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে দরজা ধাক্কাধাক্কি করে ভয় দেখায়। যার কারণে তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। দেলোয়ার হাওলাদারের স্ত্রী সেতারা বেগম (৫৮) বলেন, মিলন বাহীনি তাকে মারধর করে তার ৪টি দাঁত ভেঙ্গে দেয়। এসময় তারা হাঁস মুরগী ও দুটি গরু নিয়া যায়। তাদের ভয়ে এখন রাতে বাড়ীতে থাকেন না। পাশের তালাবদ্ধ একটি বসতঘর দেখিয়ে তিনি বলেন, ভাই হাফেজ হাওলাদারের ওই ঘরে স্ত্রী হাসিনা বেগমকে ২০১৯ সালের ১৬ অক্টোবর রাতে মিলন ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় শরণখোলা থানায় মামলা করায় তাদের মারধর করে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এরপর ভাইয়ের ছেলে শহিদুলের স্ত্রী সুখীর উপরও মিলন বাহিনীর কু-নজর পরে। এরপর মানসম্মান ও প্রানের ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যায় তারা।

গ্রাম ছাড়া ইউনুচের স্ত্রী হাসিনা বেগম মোবাইল ফোনে জানায়, রাতে ঘরের বাহিরে বের হলে মিলন তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় শরণখোলা থানায় মামলা দিলে তার স্বামী ইউনুচকে মারপিট করে তারা। অশীতিপর বৃদ্ধ আইঊব আলী আকন বলেন, তার একটি গরু মিলনের বাড়ীতে ঢুকে পড়ে। এ অপরাধে তাকে টেনে হিচড়ে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। ওই সময় মিলনের হাতে পায়ে ধরে প্রাণে রক্ষা পান তিনি। স্থানীয় যুবক বেল্লাল, জাহিদ, জাহাঙ্গীর সহ অনেকে বলেন, সাবেক গ্রাম পুলিশ সামাদ হাওলাদারের আট ছেলের মধ্যে মিলন, নেহরুল, মনির, ছগির ও নজরুল মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ, জমি দখল, ছিনতাই, নিরিহ মানুষদের মারধর সহ নানা অপরাধ করে চলছে। এলাকার কোন নতুন বউ নিয়ে আসলেই তাদের কু-নজর পড়ে। তাদের বাধা দিলে মারপিট করে এলাক ছাড়া করা হয়। এ কারণে গ্রামবাসী অতিষ্ঠ।

মিলনের প্রতিবেশী বৃদ্ধ মালেক হাওলাদার ও তার স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, মেঝ ছেলে বিয়ে করলে তার স্ত্রীর উপর মিলনের কু-নজর পরে। এ কারণে বউকে চট্টগ্রামে ছেলের কাছে পাঠাতে বাধ্য হই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে নেয় তারা। কৃষক মেনাজ হাওলাদারের পুত্র হারুন হাওলাদার বলেন, তাদের প্রতিপক্ষদের জমি চাষাবাদ করায় তার ঘর দরজা কুপিয়ে নষ্ট করে ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য সুমন তালুকদার ও সাবেক ইউপি সদস্য ছিদ্দিকুর রহমান জানান, মিলন বাহীনি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। কিছু নেতার ছত্র ছায়ায় থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, নিরীহ মানুষকে মারধর, গৃহবধু ধর্ষণ, চঁাদাবাজী, জমি দখল করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মারধর করে এলাকা ছাড়া করে তারা।

এব্যাপারে ধানসাগর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মাঈনুল ইসলাম টিপু জানান, ওই বাহিনীটি এলাকায় চাঁদাবাজী, মাদক ব্যাবসাসহ এমন কোন অপরাধমূলক কাজ নেই যা তারা করেনি। তাদের কারনে এলাকার নারীরা ঘরে থাকতে পারে না। বিষয়টি আমি অনেকবার পুলিশকে জানিয়েছি কিন্তু কোন কাজ হয় না। কোন এক অদৃশ্য শক্তির জোরে পার পেয়ে যায় তারা। এ ব্যাপারে মিলন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। মিলনের ভাই নেহারুল তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিবেশীদের সাথে বিরোধ থাকায় তারা বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। শরণখোলা থানার অফিসার ইন চার্জ এসকে আব্দুল্লাহ আল সাইদ বলেন, ওই এলাকায় দুইটি গ্রুপিং রয়েছে। তাছাড়া তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি বিরোধ ও মামলা চলে আসছে। তাই বড় কোন দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ও মেম্বরকে নিয়ে একটি বৈঠক করে সমোঝতার চেষ্টা করা হচ্ছে।