লক্ষ্মীপুরে একজন জনবান্ধব নেতার চির বিদায় রেখে গেলেন জরাজীর্ণ টিনের ঘর!

নুরুল আমিন দুলাল ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরে করোনায় ঝরে গেলো রাজনীতির ময়দানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নুরুল ইসলাম বাবুল(৫৫)। স্কুল জীবনেই হাতেখড়ি ছাত্র রাজনীতিতে তাঁর। ছাত্রলীগ থেকে তিনি আওয়ামী লীগে অত্যান্ত দক্ষতা সৎ ও নিষ্ঠার সাথে সু- দীর্ঘ সময় রাজনীতির মাঠে জনতার সুখে দুঃখে কাজ করে গেছেন।

অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে জানা যায় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন দীর্ঘ ৩৮ বছর। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে ছিলেন চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সুযোগ্য চেয়ারম্যান। দীর্ঘ রাজনীতির জীবনে তার সম্বল বা সম্পদ বলতে ৫০ বছরের পুরনো একটি ঝরাজীর্ণ টিনের ঘর।

গত ১৬ ই আগস্ট তিনি করোনাভাইরাসে মৃত্যুর পর এই আওয়ামী লীগ নেতার ঘরের ছবি এবং সাদা জীবন যাপনের ইতিহাস ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে শুভাকাঙ্খী সহ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের অসংখ্য মানুষ তাঁর ছবি পোষ্ট করে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানান।

নুরুল ইসলাম বাবুল (৫৫) নামের এই আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের রামকৃষ্ঞ গ্রামে। মৃত্যুর পূর্বেও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

এদিকে, জনপ্রিয় এ চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পরদিন (সোমবার) সকাল সাড়ে ১০টায় স্থানীয় কলেজ মাঠে পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে জানাজার সময় ঘোষণা দেয়া হলেও, হঠাৎ করে সবার অগোচরে নিদ্দিষ্ট সময়ের আড়াইঘন্টা আগে (সকাল সাড়ে ৭টায়) দাফন সম্পন্ন করা হয়।

জানা যায় এতে করে জানাজায় অংশ নিতে না পেরে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারন মানুষেরর মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ পরিলক্ষীত হয়। তাঁর ব্যাক্তিগত জীবনচারন সমন্ধে জানতে চাইলে দলীয় সূত্র ও স্থানীয়রা জানায়, নুরুল ইসলাম বাবুল স্কুল জীবনে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ গ্রহনের মধ্যে দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন।

তিনি স্থানীয় স্কুল, কফিল উদ্দিন কলেজ, উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্বে ছিলেন বলে জানা যায়। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের চন্দ্রগঞ্জ ও আশপাশ এলাকায় তাঁর হাত ধরে ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী সৃষ্টি হয়। তিনি ছিলেন কর্মীগড়ার কারিগর।

তিনি রাজনীতি করতে গিয়ে অসংখ্যবার হামলা মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তার বাবা অনেক সম্পদের মালিক ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর রাজনীতি ও পরিবারের কারনে তিনি ওই সম্পদ হারান।

তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যান্ত সদালাপী সাদা মনের মানুষ হিসেবে দলমত নির্বীশেষে পরিচিত ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় নেতা আওয়ামী লীগের প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক থেকে শুরু করে বর্তমান সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে তার রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন থেকে বিপুল ভোটের মাধ্যমে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি ওই ইউনিয়নের উন্নয়নে ও মানুষের সেবায় নিজেকে সর্বক্ষণ নিয়োজিত রেখেছেন।

তার নিরলস প্রচেষ্টায় ওই ইউনিয়নের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছিলো জেলার শীর্ষে। করোনা মহামারির শুরু থেকে তিনি একজন ‘করোনাযোদ্ধা’ হিসেবে নিজকে আত্মনিয়োগ করেন। তার ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে ও প্রবাস ফেরত ব্যাক্তিদের প্রতিটি বাড়িতে তাকে করোনা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে দেখা গেছে। নিজ হাতে ছিটিয়েছেন জীবানুনাশক ওষুধ।

ইউনিয়নে করোনায় আক্রান্ত প্রতিটি মানুষের ঘরে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে। গত ১৪ আগষ্ট তিনি করোনায় আক্রান্তের খবর জানান ফেসবুকে। ১৫ আগষ্ট সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায় অনেকের অভিযোগ, তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল প্রশাসনকে করোনা সংক্রমনের দোহাই দিয়ে নিদ্ধারিত সময়ের পূর্বেই জানাজার নামাজ শেষ করা হয়। অনেকেই ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছেন, জেলার কোথাও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। তাহলে করোনাযোদ্ধা জনপ্রিয় চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলের জানাজা সামাজিক দূরত্ব মেনে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের আপত্তি ছিল কোথায় ?

জনবান্ধব এই নেতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুপ্রেমী বাবুল প্রায় ৩৮ বছর আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও, তার সহায় সম্বল বলতে বাবার তৈরী করা ৫০ বছরের বেশী পুরনো একটি টিনের ঘর বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাস হয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগ একটানা ১২বছর ক্ষমতায়, তিনি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন।

এলাকাবাসীর বক্তব্য হচ্ছে, নুরুল ইসলাম বাবুলের মতো সৎ নেতা বর্তমান সময়ে বিরল। তিনি জীবনে কখনো নীতি ও অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি। তার ওই টিনের জরাজীর্ণ ঘরে কয়েকজন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতার পা পড়লেও তিনি কখনো আর্থিক সুবিধার কথা চিন্তা করেন নি।

তিনি বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ বিক্রি করে রাজনীতি করেছেন। ‍সুযোগ থাকলেও কখনো আর্থিক সুবিধা নেননি। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে দুই মেয়ে ও স্ত্রী রেখে গেছেন। তার পরিবারের সম্পদ বলতে এখন একটি জরাজীর্ণ ঘর আর নুরুল ইসলাম বাবুলের সততা নীতি আদর্শ রেখে গেলেন জনতার কাছে।