রৌমারীতে লজিক প্রকল্পের অনিয়ম বালুর বস্তা দিয়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ

রফিকুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় স্থানীয় সরকার বিভাগ লোকাল গভর্মেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্চ (লজিক) প্রকল্পের বরাদ্দের প্রায় কোটি টাকা বিভিন্ন প্রকল্পের নাসমাত্র কাজ দেখিয়ে হরিলুট করা হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের যোগসাজসে প্রকল্প অনুযায়ী কাজ না করেই তড়িঘড়ি করে বিল উত্তোলন করেছেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে লজিক প্রকল্পের দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নে ২২ লক্ষ, শৌলমারী ইউনিয়নে ১৯ লক্ষ ২০ হাজার, বন্দবেড় ইউনিয়নে ২৮ লক্ষ ৭৫ হাজার, ও রৌমারী সদর ইউনিয়নে ২৭ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রাস্তা মেরামত, বৃক্ষ ও বাসক পাতার চারা, পাবলিক টয়লেট, টিউবওয়েল, গাইড ওয়াল ও রিং-কালভার্ড নির্মাণ ও কৃষি খাতে বিজ সার বিতরণ। সরেজমিনে গিয়ে এসব প্রকল্পের কাজের চিত্র ও স্থানীদের অভিযোগে জানা যায়, প্রকল্প অনুযায়ী রাস্তায় বৃক্ষ ও বাসক পাতার চারা রোপনের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। জন্ত্মিরকান্দা গ্রামে পাটের বস্তায় বালু ভর্তি করে গাইড ওয়াল নির্মাণ করায় ওই এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে। চরবন্দবেড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন (এলজিএসপি)’ প্রকল্প দিয়ে ৩ বছর আগে হিয়ারিং করা হলেও একই রাস্তায় লজিক প্রকল্পের বরাদ্দ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই প্রকল্প গুলো ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরাই হচ্ছেন ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউপি সদস্য বলেন, আমাদেরকে প্রকল্পের কাজ দিলেও সম্পর্ন নিয়ন্ত্রণ করেছেন চেয়ারম্যানগণ। তাছাড়াও বিল উত্তোলনের সময়ে আমাদের কাছ থেকে চেকে স্বাক্ষর নিয়েছেন চেয়ারম্যান। পকেট থেকে যে টাকা খরচ হয়েছে তাও ফেরত দেয়নি। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নে ৮ লক্ষ টাকা ব্যয় সামসুলের বাড়ি থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ২কি:মি: রাস্তায় বৃক্ষ ও বাসক পাতার চারা লাগানো,

বদির মোড় থেকে শালুর মোড় পর্যন্ত ৫ লক্ষ টাকা ব্যয় ২ কি:মি: রাস্তা ও রাস্তার দুই পাশে বাসক পাতার চারা রোপন, হাজির হাট বাজারে ৫ লক্ষ টাকা ব্যয় একটি পাবলিক টয়লেট ও টিউবওয়েল স্থাপন, ৫নং ওয়ার্ডের মুখতোলা জাবেদ আলীর বাড়ি থেকে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত ৪ লক্ষ টাকা ব্যয় ২৫০ ফিট গাইড ওয়াল নির্মাণের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ লক্ষ টাকা। শৌলমারী ইউনিয়নে ৪নং ওয়ার্ডে চেংটাপাড়া থেকে ডাঙ্গুয়াপাড়া পর্যন্ত ৪ লক্ষ টাকা ব্যয় একটি রিং-কালভার্ড ও বৃক্ষ রোপন, ৮ নং ওয়ার্ডের টালুয়ার চর থেকে লাল মিয়ার বাড়ি হতে বাদশার বাড়ি পর্যন্ত ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ব্যয় ৫শত মিটার রাস্তা ও বৃক্ষ রোপন,

৭ নং ওয়ার্ডের বাতার গ্রাম থেকে ডিসি রাস্তার লাল মিয়ার বাড়ির নিকটে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় একটি রিং-কালভার্ড নির্মাণ, ৩ নং ওয়ার্ডের কলমের চর শাহার বাড়ি থেকে গয়টাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাস্তার করিম আর্মির বাড়ির পুকুরের ধারে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় ২শত ফুট গাইড ওয়াল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। বন্দবেড় ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ৯ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় মোজাম্মেলের বাড়ি হতে শফিকুলের বাড়ি পর্যন্ত ৪ কি:মি: রাস্তা মেরামত করার কথা থাকলেও নাম মাত্র মাটি কেটে কাজ শেষ দেন। পাশাপাশি মোজাম্মেলের বাড়ির পাশে পাটের বস্তার ভিতর বালু ভর্তি করে ২শত ফিট গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়।

এ অনিয়মের বিরুদ্ধে গ্রামবাসিরা বাধা দিলেও কোন কাজে আসেনি। বালুর বস্তা দিয়ে নির্মাণকৃত গাইড ওয়ালটি বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে ধষে যায়। এতে ওই গ্রামবাসিরা চরম দূর্ভোগে পড়ে। একই ইউনিয়নের চর বন্দবেড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আশ্রয় নেওয়ার জন্য ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় খালেকের বাড়ি হতে ছামসুলের বাড়ি পর্যন্ত ৩ কি:মি: রাস্তা মেরামত ও দুই পাশে বৃক্ষ ও বাসক পাতার চারা লাগানোর প্রকল্পটি শুধু কাগজে কলমে রয়েছে।

টাপুরচর আশ্রয় কেন্দ্রে ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দুইটি টয়লেট ও একটি টিউবওয়েল স্থাপনসহ মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। রৌমারী ইউনিয়নে পূর্ব ইছাকুড়ি রহমত আলীর বাড়ি হইতে নাবুর বাড়ি পর্যন্ত ৭ লক্ষ টাকা ব্যয় দেড় কি:মি: রাস্তা, বৃক্ষ ও বাসক পাতার চারা রোপন, চর বামনেরচর আশ্রয় কেন্দ্রে ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় ১টি টয়লেট ও ৪টি টিউবওয়েল নির্মাণ। পূর্ব ইজলামারী তছলিমের বাড়ি থেকে আইয়ুব আলীর বাড়ির মাঝ খানে ১টি রিং-কালভার্ড,

আনোয়ার আর্মির বাড়ির পাশে ১টি রিং-কালভার্ড ও ছবদের আমিনের বাড়ির রাস্তার মাঝখানে রিং-কালভার্ড নির্মাণ করা হয়। এবিষয়ে বন্দবেড় ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন, শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, দাঁতভাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান সামসুল হক ও রৌমারী সদর ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালু বলেন, প্রকল্পের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ সম্পূর্ণ করা হয়েছে।

তবে বন্যার কারণে কিছু কিছু প্রকল্পের কাজ নষ্ট হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল ইমরান বলেন, অন্যন্য প্রকল্পের চেয়ে লজিক প্রকল্পের কাজ ভালো হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা কো-অডিনেটর মুসা আহমেদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা, এ বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে পারবো না।