রাজিবপুর উপজেলার করোনা পরিস্থিতি ও জনজীবন

রফিকুল ইসলাম, রাজিবপুর  প্রতিনিধি : কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ব্রহ্মপুত্র ও সোনাভরি নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন রাজিবপুর চরাঞ্চলীয় উপজেলা। এ চরাঞ্চলের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ খেটে খাওয়া দিন মজুর ও নিম্ন আয়ের। ২৫ ভাগ মানুষ কৃষি পণ্য উৎপাদনকারী কৃষক। ১৫ ভাগ চাকুরী ও অন্যান্য পেশাজীবি। স্থানীয়ভাবে কর্ম সংস্থান না থাকায় প্রতিনিয়ত জীবন চালনার তাগিদে কাজের সন্ধানে ছুটতে হয় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে। ২৬ মার্চ থেকে নোভেল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন জেলা লকডাউন ঘোষণা করায় কর্মহীন হয়ে বিপাকে পরে যায় ঐ সব নিম্ন আয়ের শ্রমজীবি বা দিন মজুররা। বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে জীবন চালনার তাগিদে অনেককেই দেখা দেছে কর্মের সন্ধানে ছুটতে।

অপরদিকে সচেতন মহলের অনেকেই সরকার প্রদত্ত আইন মেনেই জরুরী প্রযোজন ছাড়া বাহিরে বের হন নাই। এ সংখ্যাটা অত্র উপজেলায় নিতান্তই সামান্য। উপজেলার সদর ইউনিয়নে স্বাস্থ্য বিধি কিছুটা মানা হলেও চরাঞ্চলীয়রা মানতে চায়নি কোন স্বাস্থ্য বিধি। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোর ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন, আনসার বাহিনী ও স্বেচ্ছা-সেবক বাহিনী। তবে উপজেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় করেনা স্বেচ্ছা-সেবক ইউনিট টিমদের সাথে নিয়ে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন উপজেলা প্রশাসন; সুনামও কুড়িয়েছেন স্বেচ্ছা-সেবকরা। এসব ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধাগণ নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে করোনা বিস্তার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, জীবানুনাশক স্প্রে, উপজেলার বাহির থেকে আগতদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত,

গণজমায়েত বন্ধ, শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখা, অসহায় ও দুস্থ্যদের খাদ্য সামগ্রী পৌছাতে অনেকটাই বেগ পোহাতে হয়েছে। ২৫ ভাগ কৃষকের উৎপাদিত কৃষি পণ্য স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলাতে রপ্তানী করে আয়ের টাকায় সারা বছরের খরচ চালাতো। সেটাও হয়েছে গুঁড়েবালি। এ ধকল সামলাতে হয়তো সময় লেগে যাবে বেশ কয়েক বছর। অর্থনীতির চাকা অনেকটাই ঝিমিয়ে পরেছে। করোনা আতঙ্কে সারা বিশ্ব যখন স্থবির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, শিক্ষার্থীরাও ঘরবন্ধি। সরকার পক্ষ থেকে টেলিভিশনে যদিও পাঠদান কার্যক্রম চালু রয়েছে, চরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠির জীবন-জীবিকাই যেখানে কষ্ঠসাধ্য, সেখানে টেলিভিশন দেখে শিক্ষা গ্রহণ করা তাদের পক্ষে নেহাত উচ্চ বিলাশিতা। পাঠশালা ছাড়া কোন শিক্ষার্থী দৈনন্দিন পাঠ কার্যক্রম চালু রাখতেও নারাজ। ঝিমিয়ে পরেছে শিক্ষা ব্যবস্থা। ক্ষতির হিসেবটাই গুনতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এ নিয়ে শংকায় অভিভাবক, শিক্ষক ও সুশিল সমাজ।

১ জুন শিথিল করা হয়েছে লকডাউন। সীমিত আকারে, স্বল্প পরিসরে দেশের সকল কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে হুরহুর করে বাড়ছে রোগী ও মৃত্যর সংখ্যা। গণপরিবণ চালনায় সীমিত যাত্রী নিয়ে চলাচলের নির্দেশনাও দিয়েছে রাষ্ট্র। এটি ও মানছে না পরিবহণের সাথে সংশ্লিষ্টরা। করোনার সার্বিক বিবেচনায় উপজেলা চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো এবং উপজেলা আ’লীগ সভাপতি আব্দুল হাই সরকার সাংবাদিককে জানান, শ্রম ও মেধা দিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সাথে স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ ও স্বেচ্ছা-সেবকসহ সকলের সার্বিক সহযোগিতায় উপজেলার নিম্ন আয়ের মানুষগুলোকে রাত জেগে বাড়ী বাড়ী গিয়ে সচেতন করেছি, খাদ্য সামগ্রী পৌছে দিয়েছি। এলাকা ভাল ছিল, মনে হয় এ ভাল আর থাকছে না। লকডাউন শিথিল করায় প্রশাসন ঢিলেঢালা অবস্থায় আছে।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আবারো পূর্বের ন্যায় কঠোর অবস্থানে গিয়ে রাজিবপুরকে করোনা মুক্ত রাখা যেতে পারে। এ বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ দেলোয়ার হোসেন জানান, লকডাউন থাকা অবস্থায় আমরা কঠোর অবস্থানে ছিলাম। মাক্স ব্যবহারসহ সামাজিক দুরত্ব বজায় ছিল। এখন লকডাউন শিথিল হওয়ায় সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিৎ হচ্ছে না। তবে মাইকিং করে বলা হয়েছে, দুরত্ব বজায় রাখতে এবং মাক্স ছাড়া কেউ বের হলে জেল-জরিমানা করা হবে। এ পর্যন্ত রাজিবপুরে কোন পজেটিভ রোগী পাই নি। রাজিবপুর উপজেলা এখনও করোনা মুক্ত।

৩১ মে কর্মস্থলে যোগদান করে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নবীরুল ইসলাম। তিনি জানান, এ উপজেলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কিন্ত কে শোনে কার কথা? বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে না অনেকেই। মানছে না কোন বিধি-নিষেধ। কাজেই বলতে হচ্ছে করোনা মুক্ত রাজিবপুর করোনা যুক্ত হওয়ার আশংকাই বেশি। মনে হচ্ছে সামনে ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে। এ জন্য নিজে সতর্ক থাকি, পরিবার সুরক্ষিত থাকবে, দেশ রক্ষা পাবে।