রাজিবপুরে মিথ্যা ভূমিহীন সেজে নিজেদের নামে খাস জমির বন্দোবস্ত, আশ্রীতদের উচ্ছেদের পাতারা

রফিকুল ইসলাম, রাজিবপুর(কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধিঃ প্রায় ২০ বছর আগে থেকে বসবাসরত বসত-বাড়ীতে হামলা, মারপিট জবরদখল করে তাতে ঘর উঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলা মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের শিকারপুর গ্রামে। অঢেল সম্পত্তি ও জমি-জমা থাকা সত্বেও তথ্য গোপন করে এবং ভূমি অফিসের যোগসাজসে ভূমিহীনদের বসবাসরত জমি নিজেদের নামে বন্দোবস্ত করে নিয়েছে একই এলাকার ভূমিদসু্যরা।

জানা গেছে, ২০০১ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বসত-বাড়িসহ সর্বস্ব হারায় নুরনবী, সমেশ, বেলাল, সরবেশসহ প্রায় অর্ধ শতাধিক পরিবার। ভাঙ্গন কবলিত পরিবারগুলোর অনেকেই ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী দোলা জমিতেই আবারও মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেয়। এভাবে সেখানে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে একটি গ্রাম। গ্রামের নাম করণ করা হয় মধ্য শিকারপুর। গ্রামটির বসত-বাড়ি নিচু হওয়ায় ২০০৩ সালে ‘কেয়ার বাংলাদেশ’ নামক একটি বেসরকারী সংস্থা তাদের বাড়ীগুলো মাটি ভরাট করে উঁচু করে দেয়। তখন থেকে স্বাচ্ছন্দে জীবন-যাপন করতে থাকে ওইসব পরিবারগুলো।

সোমবার সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী ইমান আলী মাতাব্বর, ৩ ছেলে সুরমান, বাবুল, নাজির, নিকট আত্মীয় মজিদ খন্দকার, ২ ছেলে মোস্তফা খন্দকার, কামরুল খন্দকার এবং মোগল হোসেন ও মর্জিনার নামে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের শিকারপুর মৌজার সরকারী খাস জমি ১ নং খতিয়ানের ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০ ও ১৩৩ দাগের সাড়ে ৩ একর জমি নিজেদের নামে বন্দোবস্ত করে নিয়ে বিষয়টি গোপন করে রাখে।

গত বন্যার সময় ওই দখলদার গ্রুপটি কৌশলে একটি ভাঙ্গা ঘরের টিন ও আসবাবপত্র রাখার জায়গা চাওয়ায় ভূক্তভোগী সরবেশ আলীর তার বাড়ীর আঙ্গিনায় ওই জিনিসপত্র রাখতে দেন। গত এক মাস আগে মজিদ খন্দকার, ইমান আলী মাতাব্বরসহ দখলদার গ্রুপটি ভাঙ্গা ঘর স্থাপনের জন্য নুরনবী, সমেশ, বেলাল ও সরবেশ আলীর ঘর ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়ার হুমকি প্রদান করতে থাকে। ঘর না ভাঙ্গাংয় ভূমিহীন বন্দোবস্তের বিষয়টি প্রকাশ করে এবং তাদের উপর হামলা চালিয়ে বেলাল ও তার স্ত্রীকে গুরুতর আহত করে। পরে বেলালের স্ত্রী নুর জাহান বাদী হয়ে গত ৫ নভেম্বর ঢুশমারা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

এ বিষয়ে ঢুষমারা থানা ওসি মুঠোফেনে জানিয়েছেন, “অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত চলছে। তদন্ত রিপোর্ট অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

ভুক্তভোগি নুর নবী, নুর জাহান ও বেলাল হোসেন সাংবাদিকের কাছে অভিযোগ করে বলেন, “সরকারী খাস জমিত ১৮-২০বছর আগে বাড়ী করছি। এহন ইমান মাতাব্বরের লোকজন আমগোরে উচ্ছেদ করবার চায়। হামলা করে, মামলার ভয় দেখায়, মারপিট করে, ঘর ভাইঙ্গা দিবার চায়। আমাগোরে জাগা-জমি নাই। সরকারের কাছে দাবী আমগোর নামে যেন ভূমিহীন বন্দবস্ত কইরা দেয়। না দিলে আমাগোর থাকার জায়গা থাকবো না।”

এ বিষয়ে অত্র এলাকার রেফাজ উদ্দিন মেম্বর বলেন, “আমার জানামতে প্রায় ২০ বছর যাবৎ এই পরিবারগুলো বসবাস করে আসছে।” ওই এলাকার হামিদুর রহমান নামের এক সার্ভেয়ার (আমিন) জানান, “সহায় সম্বলহীন পবিবারগুলোর বাড়ী নদী গর্ভে চলে যাওয়ার পর এলাকার তৎকালীন মাতাব্বরদের নিয়ে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবর আবেদন করায় এখানে তাদের থাকার জায়গা করে দেয়া হয়েছে।”

স্থানীয় ২নং ওয়ার্ড আ’লীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, “সরকারের নির্দেশে অত্র এলাকার অসহায় মানুষদের থাকার জায়গা করে দেয়া হয়েছে। প্রভাবশালী মাতাব্বরা গোপনে নিজেদের নামে ভূমিহীন বন্দোবস্ত করে এনে এই পরিবারগুলোকে বঞ্চিত করার জন্য হামলা ও মারপিট করছে। সরকারের কাছে আবেদন করবো অসহায় মানুষদের যেন বিধি-ব্যবস্থা করে দেন।”

বিষয়টি সম্পর্কে অভিযুক্ত ইমান আলী মাতাব্বর ও মজিদ খন্দকারের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জমি গুলো আমাদের কবলাকৃত জমি, নদীতে যাওয়ার ফলে খাস হয়ে যায়, সেই মোতাবেক আমরা ভূমিহীন বন্দোবস্ত করে আনছি। উচ্ছেদের বিষয়টি মিথ্যা।”

বর্তমান মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান এ সম্পর্কে জানান, “স্থাপনা থাকা অবস্থায় কোন জমি ভূমিহীন বন্দোবস্ত অন্য কারো নামে দেয়া যায় না। আবেদন দিলে বসবাসকারীদের নামে করে দেয়া যাবে।”

এ বিষয়ে রাজিবপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) গোলাম ফেরদৌস জানান,”খাস জমিতে বসবাসরত কাউকে উচ্ছেদ করে অন্য কারো নামে বন্দোবস্ত দেয়া যায় না।”