রাজিবপুরে নদীর মাঝখানে গুচ্ছগ্রাম ঘর তৈরির আগেই নদীতে বিলিন হচ্ছে প্রকল্পের ভিটা!

রফিকুল ইসলাম, রাজিবপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধিঃ তিন পাশে নদী। গুচ্ছ গ্রামের জন্য মাটি ভরাট করার পর পরই ভিটের তিন পাশে নদী ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে যাচ্ছে প্রকল্পটি। এমনই জায়গায় দেখানো হয়েছে গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্প। এতে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। ফয়দা লুটছে ইউপি চেয়ারম্যানসহ প্রশাসনের কয়েকটি বিভাগ।

প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে অবগত করার পরই সেখানে তড়িঘড়ি করে তৈরি করা হচ্ছে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর দেওয়া গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্পের কাজ। নদী ভাঙ্গন এলাকায় কেন দেওয়া হল প্রকল্পটি? আবার কেন সেটি মেরামত না করে তড়িঘড়ি করে গৃহ নিমার্ন করা হচ্ছে? এসব প্রশ্ন নিয়ে এলাকায় সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও প্রশাসনের নেই কোন পদক্ষেপ।

এমনই একটি প্রকল্প দেখিয়ে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের চড়ই হাটি গুচ্ছ গ্রামের অর্থ হরিলুটের পায়তারা করছে অসাধুচক্র। উক্ত ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সবুজ মিয়া জানান, “নদীর মাঝখানে গুচ্ছ গ্রাম হবে আমাকেও জানানো হয়নি।”

তাছাড়া ইউএনও কে জাননোর পরও সেখানে কাজ হচ্ছে। কারন ইউএনও সাহেব নিজে তার সাবেক কর্মস্থল বদরগঞ্জ থেকে মিস্ত্রি এনে নেজেই ঠিকাদারী করছেন। সরষেতেই ভূত এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের নয়াচর ফকির পাড়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক বাবুল মিয়া, কৃষক শমসের আলী ও লাল মিয়া জানান, “যে জায়গায় গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছে তা আগামী ২ মাসের মধ্যে বিলিন হয়ে যাবে। অথচ উক্ত প্রকল্পটি নদীর পূর্ব পাড়ে দিলে সরকারি টাকা কাজে লাগত। উপকৃত হত আমার মত নদীতে বিলিন হয়ে যাওয়া পরিবার গুলে।”

অফিযোগে আরও জানা গেছে, প্রকল্পটি করার পূর্বে বেশ কয়েকটি সরকারি দপ্তরের প্রধানগণ সরে জমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর তা মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর দপ্তর থেকে অনুমোদন পেয়েছে। প্রথম ধাপে মাটি ভরাট প্রকল্পের জন্য ১২৬ মে.টন চাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছিল। যা জুন/২০ এর মধ্যে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে। ১২৬ মে.টন চাল বিক্রি করে যার টাকার মূল্য হয়েছিল ৪০ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা।

অভিযোগে আরও জানান গেছে, প্রকল্প চেয়ারম্যান মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন ড্রেজার মেশিন মালিক হামিদুল, সাইদুর ও শাহীন মিয়াসহ ৫ জনের সাথে চুক্তি করে ৫ লক্ষ টাকার চুক্তির বিনিময়ে মাটি ভরাট কাজটি সমাপ্ত করেন। শেষ বিল উত্তোলনের পূবেই ভিটার ৩ দিক থেকে বন্যায় ভেঙ্গে যায়। প্রশাসন সরেজমিনে পরিদর্শন দেখিয়ে মোটা অংকের বিনিময়ে শেষ বিল পাশ করে দেন।

এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ ভুমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারি কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান জানান, “কোন জমির উপর গুচ্ছ গ্রাম হচ্ছে আমার সেটি জানা নেই।”

গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্প সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পশ্চিম-উত্তর, উত্তর-পূর্ব দিকে নদী ভেঙ্গে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে। তিন পাশে প্রবাহমান ব্রহ্মপুত্র নদ। সেখানে ৩ একর জমির মধ্যে দেড় একর জমিতে মাটি ভরাট করা হয়েছে। বাকী দেড় একর জমিতে দ্বিতীয় দফায় মাটি ভরাট করা হবে। বর্তমানে ভিটের উপর ৮টি নদী ভাঙ্গা পরিবারে ২৫ জন সদস্য অস্থায়ী ভাবে বসবাস করছে।

সেখানে বসবাসরত চান মিয়া, মধূ মিয়া, ওয়াসিম, মোতালেব, মহর আলী, ইব্রাহিম ও মাইদুল জানান, “আমরা ৩ মাস আগে থেকে এখানে বসবাস করছি। এখানে এসেই দেখি ভিটের মাটি নদীতে ভেঙ্গে যাচ্ছে।”

এ ব্যাপারে মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন এর নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, “যখন প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছিল, তখন সেখানে নদী ছিল না। বন্যার কারণে একটি খাল বের হয়ে আসছে।”

এ ব্যাপারে রাজিবপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমান জানান, “কিছু অংশ বন্যার কারণে ভেঙ্গে গেছে। আর প্রকল্পটি করার আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুড়িগ্রাম ও রংপুর গুচছ গ্রাম প্রকল্প কর্মকর্তার অনুমোতিতেই প্রকল্পটি পাশ হয়েছে। আর যে টুকু ভেঙ্গে গেছে সেটা মেরামত করা হবে। তা ছাড়া বর্তমানে ৩০টি ঘর তৈরির মালসামানা ক্রয় করা হয়েছে। উপজেলাতে ঘর তৈরির কাজ চলছে। যার বরাদ্ধ প্রায় পনে ৩ কোটি টাকা।”

কেন নদী ভাঙ্গন এলাকায় গুচ্ছ গ্রাম দেওয়া হল? এবং কেনই বা পুনরায় কাজ হচ্ছে? এর সদত্তোর মেলেনি কোন কর্মকর্তার নিকট।
এ ব্যাপারে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নবীরুল ইসলাম জানান, “বন্যার কারনে কিছু অংশ ধ্বসে গেছে। তা পুরণ করে দেওয়া হবে। আপনারা যা তথ্য নিবেন পিআইও সাহেবের নিকট থেকে নিবেন।”

এ বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো জানান, “কোথায় গুচ্ছ গ্রাম হচ্ছে তা আমি জানিনা তবে এলাকার লোকজন অভিযোগ করছে, সেটি নাকি ভেঙ্গে যাচ্ছে।” এ ব্যাপারে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তার সাথে বার বার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।

গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্পটি সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে সরে জমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এলাকাবাসী জোড় দাবী জানিয়েছেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নিকট। তা না হলে উক্ত ইউনিয়নের নাওশাল আশ্রয়ণ প্রকল্পের মত নদী গর্ভে বিলিন হবে। সরকারের কয়েক কোটি টাকা গুচ্চা যাবে।