মহাসড়কে ‘চাঁদায়’ চলছে লেগুনা, স্টিয়ারিং শিশুদের হাতে

রতন দাশ, সাতকানিয়া প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম আইন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে লেগুনা চলার সুযোগ নেই। কিন্তু শত শত লেগুনা চলছে নিয়মিত, যার বেশির ভাগই আবার ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ। লেগুনার অধিকাংশ চালক শিশু।

প্রায় প্রতিদিনই এসব লেগুনা ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু থেকে কক্সবাজার শহর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি রুটে ভাগ হয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় নির্বিঘ্নে চলাচল করছে লেগুনাগুলো।

আবার এসব রুটে বিভিন্ন সমিতি কিংবা শ্রমিক সংগঠনের নামে ওয়াবিলের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে পকেট ভারী করছেন কথিত সংগঠনের নেতারা। অভিযোগ আছে, উত্তোলনকৃত চাঁদার নির্দিষ্ট অংকের টাকার ভাগ প্রতি মাসে যাচ্ছে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা, শ্রমিক সংগঠনের নেতা ও পুলিশের পকেটেও।

ফলে কোন ধরণের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চালকের আসনে বসেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোররাই এসব প্রাণঘাতী লেগুনা চালাচ্ছে নির্বিঘ্নে। আর এতে বাড়ছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের শাহ আমানত সেতু থেকে রামু পর্যন্ত এলাকা ভিত্তিক ১০টি রুটে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ লেগুনা চলাচল করছে।

তার মধ্যে বেশিরভাগ লেগুনা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চকরিয়ার অংশে চলাচল করছে। লোহাগাড়া উপজেলার বটতলী মোটর স্টেশন থেকে চকরিয়া এবং বটতলী মোটর ষ্টেশন থেকে সাতকানিয়ার কেরানী হাট পর্যন্ত নামে-বেনামে দেড় শতাধিক যাত্রীবাহী লেগুনা চলাচল করছে।

এসব লেগুনার অধিকাংশই ফিটনেস ও বৈধ কাগজপত্রবিহীন। নেই কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স। আবার অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরের হাতেই লেগুনার স্টেয়ারিং। এছাড়াও চালকের সহকারী হিসেবে লেগুনার পেছনে অনেকটা বাঁদুড় ঝুলিয়ে কাজ করছে কোমলমতি শিশুরা। এসব লেগুনার কারণে মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দূর্ঘটনা। আর এতে অকালে প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলছে।

স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব লেগুনা নির্বিঘ্নে চলাচল করলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসনের এ নিরবতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ফলে আতংকে পরিণত হয়েছে লেগুনা। গত ২১ মার্চ রাতে লোহাগাড়ার জাঙ্গিয়াস্থ চুনতি ফরেষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা একটি লবণবোঝাই ট্রাকের সাথে যাত্রীবাহী লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই চালক-হেলপারসহ ১৪ জন নিহত হয়।

এতে লেগুনার আরো ৩ যাত্রী আহত হয়। এ দুর্ঘটনায় লেগুনার চালক-হেলপারসহ ১৭ যাত্রীর সবাই হতাহত হন। এছাড়া গত ২২ জুলাই চকরিয়ার হারবাং বুড়ির দোকান এলাকায় কাভার্ডভ্যানের সাথে যাত্রীবাহী লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে লেগুনার চালক-হেলপারসহ ৬ জন নিহত এবং ৭ জন আহত হয়। এ দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় লেগুনার ২০ যাত্রী নিহত এবং ১০ জন আহতের ঘটনা ঘটে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) লোহাগাড়া উপজেলা কমিটির আহবায়ক মোজাহিদ হোসাইন সাগর বলেন, লোহাগাড়া থেকে চকরিয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের এ অংশে অসংখ্য বাঁক ও গতিময় সড়ক হওয়াতে লেগুনার মতো ছোট গাড়িগুলো বারবার দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এছাড়াও এসব লেগুনার অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর চালক ও শিশু হেলপারের কারণে দুর্ঘটনা আরো ব্যাপকহারে বাড়ছে।

জানতে চাইলে দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াছিন আরফাত বলেন, কোরবানির ঈদের আগেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে কোন লেগুনা চলতে পারবে না। এখন ২-১টি চললেও তা চুরি করে চালাচ্ছে। লেগুনার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।