ভূমিদস্যুদের দখলে ডাকাতিয়া নদী! উচ্ছেদ অভিযান এখন সময়ে দাবি

মোহাম্মদ বিপ্লব সরকার, চাঁদপুর প্রতিনিধি: : ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্বের কারণে মৃতপ্রায় ডাকাতিয়া নদী । নেই জোয়ার-ভাটার উত্তাল ঢেউ।অবৈধ বালুমহল আর দূষণে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে ডাকাতিয়া। নদীকে ঘিরে চাঁদপুর থেকে লাকসাম পর্যন্ত নদীর দু’পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বালুমহল।

সরকারের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য। ডাকাতিয়া নদীতে চাঁদপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ৫নং ঘাট, ৩নং ঘাট, ১০নং ঘাট, চৌধুরী ঘাট ও নতুন বাজার এলাকার নদীর দুই পাড়ে শত শত পাকা বিল্ডিং ও আধাপাকা টিনসেড ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর নির্মাণ করে ডাকাতিয়া পাড় দখল করায় শহরে পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব স্থাপনা কয়েকবার উচ্ছেদ করা হলেও দখলমুক্ত হয়নি। উচ্ছেদের পরবর্তী সময়ে আবারও দখল! ডাকাতিয়া নদীর মেঘনার প্রবেশ মুখের চাঁদপুর পুরান বাজার ও নতুন বাজারসহ বেশিরভাগ এলাকায় নদীই দখল হয়ে নদী সরু হয়ে গেছে। এছাড়াও জেলাসহ ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, শাহরাস্তি উপজেলায় নদীর দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বালুমহল।

এসব বালু মহলের বালু দিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে ডাকাতিয়া। এতে নাব্যতা হারাচ্ছে নদী। অন্যদিকে দখলের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ আটকে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনও ব্যহত হচ্ছে। বলাখাল, হাজীগঞ্জ, আলীগঞ্জ, শাহরাস্তি, জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন স্থানে নদীর পাল দখল করে অবৈধ বালু ব্যবসার কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে প্রমত্তা ডাকাতিয়া। বালু ব্যবসায়ীরা বালু ফেলে নদীর নাব্যতা কমিয়ে আনছে।একসময় ওইসব বালু ব্যবসায়ীরা এ জমি নিজেদের বলে বিক্রয় করে দিচ্ছেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ডাকাতিয়া নদীটির বেশিরভাগ জায়গা দখল করে রেখেছে ভূমিদস্যুরা।

হাজীগঞ্জ বাজারের মুরগির ব্যবসায়ীদের মুরগি ড্রেসিং করার পর যে ময়লা আবর্জনাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসা-বাড়ির পয়ঃনিষ্কাষণের বর্জ্য এবং পৌর কসাইখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। এতে নদীর পাশাপাশি দূষিত হচ্ছে পরিবেশ এক সময় এর দুই পাশে গড়ে উঠে জেলে পল্লী। এ নদীতে মাছ ধরেই তারা জীবিকা নির্বাহ করতো বহু জেলে পরিবার।বালুমহলের কারণে দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে প্রমত্তা ডাকাতিয়া। নদীতে নেই মাছ। তাই বাপ-দাদার ব্যবসা নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে অনেক জেলে।

এসব জেলেদের দিন চলছে অনেক কষ্টে। হাজীগঞ্জের কয়েকজন জেলে জানান, ডাকাতিয়ায় আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। নদীও ছোট হয়ে গেছে। শীতকালে পানি নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমরা মাছ ধরা ছেড়ে দিয়েছি। বর্ষাকালে এ নদীতে আইড়, বাইলা, পুঁটি ও চিংড়ি মাছ পাওয়া যেত। নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা নানা প্রতিশ্রুতি শোনালেও এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

তবে চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) নির্বাচনী এলাকার সাংসদের উদ্যোগে হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি এলাকার প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল ড্রেজিং কার্যক্রম সম্পন্নের দিকে। ডাকাতিয়া নদী বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলা দিয়ে বয়ে গেছে। এর দৈর্ঘ্য ১৪১ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৬৭ মিটার। ডাকাতিয়া নদী মেঘনার একটি উপনদী। নদীটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা জেলার বাগমারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তীতে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এরপর কুমিল্লা- লাকসাম ও চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা অতিক্রম করে চাঁদপুরের গিয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়। ডাকাতিয়া বর্ষাকালে ভারতের দিক থেকে বিপুলসংখ্যক পাহাড়ি প্রবাহকে গ্রহণ করে। আর বছরের বাকি সময়ে নদীটি মেঘনার জোয়ারের পানি গ্রহণ করে থাকে। এক সময় নদীটি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার কাছে মেঘনায় মিলিত হতো।

বর্তমানে ডাকাতিয়া বিভক্ত দুই ধারায়। মূল ধারাটি রায়পুরে মেঘনায় মিশেছে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে বড় ধারাটি পড়েছে চাঁদপুরের মেঘনায়। ডাকাতিয়া নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবৈধ বালুমহল ও স্হাপনা উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।