ভাল নেই কেশবপুরের কালোমুখো হনুমান

আক্তার হোসেন, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের কেশবপুরে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য সংকট ও করোনা ভাইরাসের মত দুর্দিনে কেশবপুর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান। দেশে বিলুপ্ত প্রায় এ হনুমানের পরিচর্যা ও সংরক্ষণে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন কেশবপুরের জনসাধারণ। বিরল প্রজাতির এই কালোমুখো হনুমান এর কারণে যশোরের কেশবপুর উপজেলা আজ বাংলাদেশের মানচিত্রে সুপরিচিত এলাকা হিসাবে গড়ে উঠেছে।
কিন্তু বর্তমানে আমাদের গর্ব, আমরা যা নিয়ে অহংকার করতাম তা কালের বিবর্তনে আজ হারাতে বসেছি। আমরা কি পারি না, সঠিক পরিচর্যা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে বিরল প্রজাতির এই কালোমুখো হনুমানকে কেশবপুরের বুকে টিকিয়ে রাখতে? গত কয়েকশ’ বছর যাবৎ কেশবপুর সদর ও পার্শ্ববতী এলাকার ১০-১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিরল প্রজাতির এই হনুমান বসবাস করছে।বর্তমানে কালোমুখো হনুমান দেখতে পাওয়া যায় কেশবপুর উপজেলা পরিষদ চত্বর, ব্রহ্মকাঠি, পাইলট স্কুল এলাকা, হাসপাতাল এলাকা, ভোগতি, নরেন্দ্রপুর, রামচন্দ্রপুর, মধ্যকুল, বালিয়াডাঙ্গা, মণিরামপুরের মুজগুনি, বাঙালিপুর, দুর্গাপুর, ফকির রাস্তা এলাকায়। সবমিলিয়ে পাঁচ শতাধিক কালোমুখো হনুমানের বসবাস রয়েছে এসব এলাকায়।
কেশবপুরের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে খাদ্যের সন্ধানে তাদের এলাকায় হানা দিচ্ছে হনুমানের দল। কেশবপুর থেকে মনিরামপুর উপজেলার মুজগন্নি, দূর্গাপুর, সৈয়দ মাহমুদপুর, গোবিন্দপুর, বাটবিলা, বাঙালিপুর, নাগোরঘোপ, ফকিররাস্তা পেরিয়ে এখন পৌর শহরে অবস্থান করছে। এছাড়া পৌর শহরের মোহনপুর, বিজয়রামপুর, হাকোবা, গাংড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় হনুমানের পালের আনাগোনা বেড়েছে। মনিরামপুরের স্থানীয়রা ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের জানান, হনুমানগুলো আগে খাবারের জন্য বাজার এলাকায় ভিড় করতো। কিন্তু করোনা সংক্রমণ রোধে বাজারের দোকান ও হোটেল বন্ধ থাকায় তারা এখন ফসলের খেত ও বাড়িতে আসছে। বাঙালিপুরের কামরুজ্জামান বলেন হনুমান আমার বাসার লাগানো আম লিচু ও বিভিন্ন ফল গাছের ফল খেয়ে ও নষ্ট করছে কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুধু সবজি বা গাছের ফল নয়, পাট গাছের কচি ডগা, কচি ডাবও খেয়ে ফেলছে ক্ষুধার্ত হনুমান।
এমনকি সুযোগ পেলে ঘরে ঢুকে রান্না করা হাড়ি ভর্তি খাবার পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। মণিরামপুর উপজেলা বন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জানান, কালোমুখো হনুমানগুলো পাশের কেশবপুর উপজেলা থেকে এসেছে। কেশবপুর পৌর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হরিহর নদীর তীরে হনুমানের অভয়ারণ্য গড়ে ওঠে প্রায় দেড় যুগ আগে। সরকার এ অভয়ারণ্যে হনুমানের জন্য খাদ্যও বরাদ্দ করেছে। এদিকে কেশবপুরের দলছুট কালোমুখো কিছু হনুমান খাদ্যের সন্ধানে আবার পাইকগাছায় অবস্থান করছে। তারা প্রতিদিন সেখানকার এলাকার বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করে থাকে। পাইকগাছার উপজেলা বন কর্মকর্তা প্রেমানন্দ রায় জানান, ২০১৮ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে একটি হনুমান পৌর সদরের দলিল লেখক সমিতি ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মধুমিতা (মিষ্টি পুকুর) পার্কের মার্কেটের উপর যাওয়ার চেষ্টা করে।
এ সময় মার্কেটের সামনে বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে হনুমানটি নীচে পড়ে যায় এবং সাথে সাথে তার মৃত্যু হয়। এছাড়াও ওই বছরেই একই স্থানে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে অনুরূপ আরেকটি হনুমানের মৃত্যু হয়। বর্তমানে হনুমানের সংখ্যা কতটি এবং প্রতিদিন কী পরিমাণ খাদ্য তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে- এব্যাপারে কেশবপুর উপজেলা বন কর্মকর্তা আব্দুল মোনায়েম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কেশবপুরে হনুমানের সংখ্যা সঠিকভাবে বলা সম্ভব না। তবে বর্তমানে প্রায় ছয়শত কালোমুখ হনুমান রয়েছে। সরকারিভাবে কালমুখো হনুমানের জন্য কেশবপুরে প্রতিবছর ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই টাকা থেকে ভ্যান ও লেবার খরচসহ প্রতিদিনের বরাদ্দ ৩৫ কেজি পাকা কলা, চার কেজি বাদাম এবং চার কেজি পাউরুটি। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ফলে খাদ্যাভাবে হনুমানের দল বিভিন্ন লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এর আগে ২০১৬ সালে বন বিভাগের টেন্ডারের মাধ্যমে মেসার্স আলমগীর হোসেন নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘জীব ও বৈচিত্র সংরক্ষণ’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন এক মণ পাকা কলা, খোসাসহ আড়াই কেজি বাদাম ও দুই কেজি পাউরুটি সরবরাহ করতো। কিন্তু বর্তমানে এসকল খাদ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ও বরাদ্দকৃত টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি না পাওয়ায় এখন সেটি সম্ভব হচ্ছে না বলে একটি সূত্রে জানা যায়।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে হনুমানদের সংরক্ষণ ও সরকারিভাবে খাদ্যে সরবরাহের দাবিতে কেশবপুরের সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষকে নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের মুখে সরকার টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে হনুমানদের খাদ্য হিসেবে কলা,বাদাম ও পাউরুটি সরবরাহ করে আসছে। তবে সেই খাদ্যের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম। পাশাপাশি প্রতিবছর কালোমুখো হনুমানের বংশ বিস্তারের কারণে এর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বরাদ্দকৃত খাবার তাদের জীবন নির্বাহের জন্য খুবই অপ্রতুল। কেশবপুরের আশপাশ এলাকায় অবস্থানরত আরও দুই শতাধিক হনুমানের দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে। যে কারণে এসব হনুমানরা প্রতিনিয়ত খাবারের অন্বেষনে ছুটে চলছে বিভিন্ন এলাকায়। হানা দিচ্ছে সাধারণ মানুষের রান্না ঘর,দোকানপাট ও ফলজ গাছে। তবে কি খাদ্যাভাবে অতি কষ্টে এভাবেই দিনাতিপাত করবে কেশবপুরের ঐতিহ্য কালামুখো হনুমান? নাকি সঠিক তদারকি ও খাদ্য বাড়ানোর ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ভাববে? হনুমান সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও নেওয়া দরকার বলে মনে করছে কেশবপুরবাসী।