বেতনা নদী দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে বর্ষা মৌসুমে দুই তীরের লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী

রবিউল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা জেলা সদরের বুক চিরে প্রবহমান বেতনা নদী দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে। এক সময় এ নদীতে চলত লঞ্চ, স্টিমারসহ বড় বড় গয়নার নৌকা। গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ নৌকায় চড়ে জেলা সদরে আসত নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে।

ব্যবসা-বাণিজ্য আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে নদীটি জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় বেতনার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দখল হয়ে যাচ্ছে বেতনা নদীর দুই তীর। এখন চর দখলে চলছে প্রতিযোগিতা। কেউ করছেন মাছের ঘের, কেউ করছেন ইটভাটা।

কেউবা দখলীয় জমিতে গড়ে তুলেছেন বসত ঘর। চলছে চাষাবাদও এককালের বেতনা নদী এখন এক মরা খালে পরিণত হয়েছে। যে নদীতে চলতো লঞ্চ স্টীমার বড় নৌকা এখন সে নদী মানুষ পায়ে হেঁটে পার হয়। এদিকে বেতনার এই দুর্দশায় পুলকিত হয়ে এক শ্রেণির লোভী মানুষ দখল করে নিচ্ছে বেতনার চর। অন্যদিকে কলারোয়ার মুরারিকাঠি থেকে সদর উপজেলার সুপারিঘাটা পর্যন্ত নদীর এই দু:সময়ে দখলবাজরা দখল করে নিয়েছে দুই পারের জমি।

প্রশাসনের সামনেই ভূমিদস্যুরা দখল কার্যক্রম চালালেও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কার্যকরি কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে অর্থের বিনিময়ে অর্ধশত ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে অকেজো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে সবগুলি স্লুইসগেট। নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, অন্তত ৩০টি গ্রাম এবং ১০টি বিলের পানি এই নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হতো।

নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানিনিষ্কাশনে বাধার কারণে জলাবদ্ধতায় সৃষ্টি হয়। বিলগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পানি থাকে। বর্ষা শেষ হলোও পানি সরে না। সেচ দিয়ে কোন কোন বিলের পানি সরিয়ে একটি ফসল করেন চাষিরা। পলি জমে এর তলদেশ ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। বর্ষা মওসুমে পানি ছাপিয়ে পড়ায় পার্শ্ববর্তী জনপদ তলিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরই ফসল হারাচ্ছেন কৃষক। ২০১৫ সালে ১৪ কোটি টাকা ব্যায়ে বেতনা খননের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।

এতে যেমন নানা অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল তেমনি ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক কারণে সরকার এই খনন প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে। পরে সেই খননে সুফল দুরে থাকুক নদী পলি জমে আরও ভরাট হয়ে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে এর দুই তীর জোর করে দখল চলছে। যদি অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ না করা হয় তাহলে দুই তীরের দশ থেকে বার লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়বে।

সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ, লাবসা, বলী, ঝাউডাঙ্গা ও কলারোয়ার মুরারিকাঠি ইউনিয়নের বহু গ্রাম ও বিলের পানি নিস্কাশনের একমাত্র পথ বেতনা নদী। কিন্তু পলি পড়ে ভরাট হবার পাশাপাশি এর চর দখল হয়ে যাওয়ায় নদী হয়ে পড়েছে প্রাণহীন। ফলে বর্ষা মৌসুমে এর দুই তীরের লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দখলের কবলে পড়ছে নদীর দুই তীর। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের সঙ্গে উপকূলীয় বাঁধ আরও উঁচু করা, স্লুুইসগেট সংস্কার, ইজারা দেয়া খাল পুনরুদ্ধার এবং চিংড়ি চাষে অবৈধ পাইপগেট বন্ধের দাবি জানান স্থানীয়রা।

জানা যায়, বেতনা নদীর দুর্দশা শুরু হয় ৯০ এর দশকে। যে নদীতে এক সময় ভাসতো লঞ্চ-কার্গোসহ বিভিন্ন নৌযান প্রায় একশ’ কিলোমিটারের নদী এখন মরাখাল। যশোর ও সাতক্ষীরার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রাচীন নদীর দুই তীরে দশ লাখ লোকের বাস। ধ্বস নেমেছে কৃষি ব্যবসা মৎস্য চাষেও। নদী দখল করে গড়ে উঠেছে বাড়িঘর। এখান থেকে মাত্র ২০-২৫ বছর আগেও নদীর হিংস থাবায় বর্ষা মৌসুমে দুই কূল ভাসিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতো। নদীতে মাছ ধরে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করত।

আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি সেচকাজে ব্যবহার করে কৃষক জমিতে ফলাত সোনার ফসল। কালের আবর্তনে দখল আর দূষণের কবলে পড়ে আশীর্বাদের সেই বেতনা নদী এখন মৃত। ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরের ভৈরব নদ থেকে বেতনার উৎপত্তি। নদীটি সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলা থেকে শুরু করে আশাশুনি উপজেলার চাপড়া এলাকার মরিচচাপ নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময়ের প্রবল খরস্রোতা সেই বেতনার খেয়াপারে মাছ ধরতে বর্ষায় ছুটে চলা মাঝিমাল্লাদের আর দৌড়ঝাঁপ নেই।

জেলার ৪৬ কিলোমিটার নদীর বুকে ইটভাটা, অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় জোয়ার-ভাটা বছর পনের আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর বুকে চর ভরাট করে অসংখ্য ইটভাটা, বসতবাড়ি, মৎস্য ঘের তৈরি করায় নদীটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। সরেজমিন দেখা গেছে, কলারোয়া উপজেলা থেকে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার বিনেরপোতা হয়ে মাছখোলা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে দখল করে ইটভাটার গড়ে উঠায় পলি পড়ে হুমকির মুখে এখন নদীটি। কোথাও কোথাও নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। দখলদার আর ইটভাটা মালিকরা নদীকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, বেতনা নদীর অস্তিত্বই এখন বোঝা মুশকিল।

তবে এসব ভাটা মালিকের বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে কোনো সময় ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের। মাঝে মধ্যে পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট হলে অসাধু কর্মকর্তারা ভাটা মালিকসহ দখলদারদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করলেও পরবর্তী সময়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ফলে বিশেষ করে ইটভাটা মালিকরা নদী দখলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কলারোয়া উপজেলা থেকে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার মাছখোলা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে নদীর তীর ও নদীর বুক দখল করে প্রায় ৪০টির মতো ইটভাটা গড়ে উঠেছে।

এসব ভাটা মালিকের কারণে বেতনা নদী মরণদশায় পরিণত হয়েছে। আর বি বি ব্রিকসের মালিক মোকছেদ বিনেরপোতা এলাকায় শৈলখাল এবং শালিখা নদীর দু‘টি বেড়িবাঁধ হজম করে ফেলেছে। ভুমিহীনদের উচ্ছেদসহ কবরস্থানের মাটি কাটার হুমকি দিচ্ছে। ইটভাটা মালিকরা ইচ্ছামত বাঁধ দেয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের অভাবে বিপাকে পড়তে হয় কৃষক ও এলাকাবাসীকে। বেতনা ও এর সংযুক্ত খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার কবলে পড়তে হয় তাদের।

সরেজমিন দেখা গেছে, বিনেরপোতা থেকে মাছখোলা পর্যন্ত নদীর তীরে ও বুকে চর দখল করে অসংখ্য ইটভাটা গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালী কিছু ভাটা মালিক। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নীরব থাকায় তাদের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশ কুমার সরকার জানান, বেতনা নদীর অবৈধ দখলদার ও ইচ্ছামত মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করছে তালিকা করে মোবাইল কোট পরিচালনা করা হবে।

যেই হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। পরিবেশবিদদের মতে, জরুরী ভিত্তিতে বেতনা নদী খনন করা প্রয়োজন। নদীর বুকে পিলার স্থাপন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য ব্রিজ নির্মাণের ফলে বেতনা নদী এক দশকের মধ্যেই মরণদশায় নিপতিত হয়েছে।