বাড়িওয়ালাকে ফাঁসাতে ভাড়াটিয়ার শিশু হত্যা,ফেঁসে গেলেন হত্যাকারী

মোঃ রাশেদ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ  নগরীর বাকলিয়ার আলোচিত শিশু আরাফ হত্যা মামলার অন্যতম পলাতক আসামী নাজমা বেগমকে (৪০) আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে পাঁচটায় কোতোয়ালির মনোহরখালী এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে বাকলিয়া থানা পুলিশ। আটক নাজমা বেগম কুমিল্লার মুরাদনগর থানার থোল্লা বাখরনগরের তাজুনুর ইসলাম প্রকাশ বাবুলের স্ত্রী বলে জানা গেছে। বাকলিয়া থানার ওসি নেজাম উদ্দীন জানান, মামলাটির বাদী মো. আব্দুল কাইয়ুম (৩৮) অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে চাকুরী করেন।

তিনি বাকলিয়ার মিয়াখান  নগরে স্ত্রী ফারহানা ইসলাম(২৭), ছেলে আব্দুর রহমান আরাফ (২), শালিকা নাসরিন ইসলাম (১৮) এবং সাবলেট ভাড়াটিয়া রাসেল হোসেনসহ ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তিনি অন্যান্য দিনের মত বিকাল বেলা অফিসিয়াল কাজে চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার কে.সি.দে রোডে যান। বিকাল অনুমান সাড়ে পাঁচটার সময় মোবাইল ফোনে তার স্ত্রী তাকে জানায় যে, তাদের ছেলে আরাফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংবাদ পাওয়া মাত্রই তিনি মোটর সাইকেলে দ্রুত বাসায় আসেন। বাসায় আসার পর তার স্ত্রী জানায় যে, ছেলে আরাফ বিকাল পাঁচটার পর বাসার সামনে খেলতে বের হয়। বেশ কিছুক্ষন অতিবাহিত হওয়ার পরও ছেলে বাসায় ফিরে না আসলে তার স্ত্রী বাসা থেকে বের হয়ে তাকে দেখতে না পেয়ে তাকে ফোন দেয়।

বাদী আশেপাশে এবং মহল্লায় সব অলি-গলিতে ছেলেকে খোঁজ করেন। স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এবং এলাকায় মাইকিং করে ছেলেকে খোঁজার ব্যবস্থা করেন। কোথাও ছেলেকে না পেয়ে সেদিন (৭ জুন) বাকলিয়া থানায় এসে একটি নিখোঁজ ডায়রী করেন। থানায় জিডি করে বাসায় যাওয়ার সময় অনুমান সাড়ে আটার সময় স্থানীয় মো. হেলাল মোবাইল ফোনে জানায় যে, আরাফকে তাহার ভাড়া বাসার বিল্ডিংয়ের ছাদে অর্থাৎ বাকলিয়া থানাধীন হাজী মনসুর আলী রোড ম্যাচ ফ্যাক্টরী মিয়াখান নগর মিয়ার বিল্ডিংয়ের ছাদে পানির ট্যাংকে পাওয়া গেছে। সংবাদ পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন স্থানীয় লোকজন তাহার ছেলে আরাফ (২)কে পানির ট্যাংক হতে তুলে মৃত অবস্থায় ছাদে শুয়ে রেখেছে।

সংবাদ পেয়ে তৎক্ষনাৎ পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং স্থানীয় লোকের সহায়তায় বাদীর ছেলে আরাফ(২)কে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত ডাক্তার তার ছেলেকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন এবং লাশ মর্গে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। পুলিশ চমেক হাসপাতালের মর্গে আরাফ এর সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। সেদিন বিকালের পর কোন সময় ছেলেটিকে হত্যা করে লাশ গুম করতে বিল্ডিংয়ের ছাদে পানির ট্যাংকে ফেলে দেয়। তার ছেলের এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে তিনি এবং বাদী তার পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বাদী হত্যা মামলা দায়ের করার পর তদন্ত নামে পুলিশ তারপর আজ মঙ্গলবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত আসামি নাজমা বেগমকে আটক করা হয়।

আটকের পর আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি হলে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে। আসামি নাজমা বেগম জবানবন্দিতে জানায়, তার তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। তারমধ্যে দুই মেয়ে গার্মেন্টেসে কাজ করে। দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে মো. হাসান (২৩) মালিক নূরুল আলমের সাথে মিয়ার বিল্ডিংয়ে বিগত ২ বছর যাবৎ ৭০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছে । ছেলে মো.হাসান(২৩) মালিকের বিল্ডিং এর দারোয়ানের হিসেবে কাজ করে। অন্য ছেলে ফিশারী ঘাটে মাছের দোকানে কাজ করে। গত তিন বছর পূর্বে তার স্বামী তাজুল ইসলাম বাবুল হার্নিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আসামীর স্বামীকে প্রাইভেট হসপিটালে অপারেশন করিয়ে সুস্থ করতে আসামীর প্রায় তিন লাখ টাকা সুদের উপর ধার করিতে হয়।

এই সুদের কিস্তির টাকা সহ সংসার পরিচালনা করতে গিয়ে আসামি নাজমা বেগম দিনে দিনে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তার স্বামীও কোন কাজকর্ম করতে পারে না। তার উপর গত তিন মাস যাবৎ লকডাউন শুরু হলে মেয়েদের গার্মেন্টেসের চাকুরী বন্ধ হয়ে যায়। সে ধার দেনা করে কাগজে ঠৌঙ্গা তৈরী করে কোনরকমে সংসার চালানোর চেষ্টা করে। এলাকায় বিভিন্ন লোকজন নাজমার নিকট প্রায় নয় লক্ষ টাকা পাওনা আছে। এই টাকা পরিশোধ করার কোন উপায় আসামীর কাছে নাই। ছেলে মো. হাসানকে দারোয়ানের চাকুরিতে খাটালেও ঠিকমত বেতন না দিয়ে তালবাহানা করছিল। নাজমা ছেলের বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলে মালিকের সাথে আসামীর ভুল বুঝাবুঝি হয়। এই সুযোগে এলাকার পূর্ব পরিচিত মো. ফরিদ আসামীর বিল্ডিংয়ের মালিক মিয়াকে ফাঁসানোর জন্য উক্ত বিল্ডিংয়ে একটি ঘটনা ঘটানোর প্ররোচনা দিয়ে আসছিল।

নাজমাকে নগদ টাকাসহ বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করার আশ্বাস দেয়। আসামি এক দিকে পাওনাদারদের চাপ অন্য দিকে ফরিদ এর প্রলোভনের একপর্যায়ে ফরিদের কথামত কাজ করতে রাজি হয়। আসামি নাজমা বেগম বিল্ডিংয়ের মালিককে ফাঁসাতে ভাড়াটিয়া আব্দুল কাইয়ুম এর দুই বছরের শিশু পুত্র আরাফ’কে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়টি ফরিদকে জানায়। তখন ফরিদ বলে “তুমি কাজ কর টাকা তোমার জন্য রেডি আছে”। আসামি ফরিদের কথামতো গত ৭ জুন সন্ধ্যায় ৬টার দিকে বাইরে থেকে বাসায় আসার পথে তাদের বিল্ডিংয়ের নীচতলায় (পাকিং) আরাফ’কে পার্কিংয়ে হাঁটতে দেখে আশপাশে কোন লোকজন না দেখে আদর করার ছলে কোলে নেয়।

আরাফও আসামির কোলে উঠে। আসামি আরাফকে কোলে নিয়ে বিল্ডিংয়ের ছাদের দিকে যেতে থাকে। আসামি নাজমার ছেলে হাসান (২৩) (বিল্ডিংয়ের দারোয়ান) তার কাছে থাকা চাবি দিয়ে ছাদের দরজার তালা খুলে দেয়। আরাফকে নিয়ে অষ্টম তলার উপর সিঁড়ি বেয়ে পানির ট্যাংকের উপরে উঠে শিশু আরাফকে পানির ট্যাংকের ভিতর ফেলে দেয়। আসামি যখন আরাফকে নিয়ে পানির ট্যাংকের উপর উঠে পার্শ্ববর্তী বিল্ডিংয়ের ছাদের উপর হইতে নাজিম উদ্দিন ও আলিম উদ্দিন সহ কযেকজন দেখে ফেলে । কিন্তু আসামী সেই দিকে কোন খেয়াল না করে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তার কোলে থাকা আরাফকে ট্যাংকের মুখ দিয়ে ভিতর ফেলে দেয়।

ফেলে দেওয়ার পর আসামী উপর থেকে নেমে তার বাসায় চলে আসে। ইতোমধ্যে বাচ্চকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে এলাকার মসজিদের মাইকিং করা হয় । ঘটনার পর আসামি তার বাসায় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে