বরিশালে দেশপ্রেমিক স্বপ্নদ্রষ্টা যখন পথ প্রদর্শক

প্রিন্স তালুকদার, বরিশাল প্রতিনিধি : “তোমরা ব্রিটিশ পুলিশ নও, তোমরা পাকিস্তানের পুলিশ নও, তোমরা লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ।” হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশের উদ্দেশ্যে এই কথাটি বার বার বলতেন। বঙ্গবন্ধুর এই কথাগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করে পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন একজন দেশপ্রেমিক স্বপ্নদ্রষ্টা, যখন যেখানে যেভাবে জনসেবায় নিয়োজিত ছিলেন সেখানেই কর্মের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন একজন আদর্শ পথপ্রদর্শক, একজন অভিভাবক, একজন পিতা।

সহকর্মীদের কাছে হয়ে ওঠেন একটি আদর্শ, একটি বিস্ময়, একটি প্রত্যাশার নাম। একটি অগ্নিশিখার মত নিজের আলোয় আলোকিত করেন পুরো একটি ইউনিট। পেশাগত জীবনে মানুষের কল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য ইতিমধ্যেই দেশ যাকে তাঁ র কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ দু-দুবার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদকে ভূষিত করেন। হ্যাঁ, আমি আমার ইউনিট প্রধানের কথা বলছি, আমি একজন ডায়নামিক লিডার এর কথা বলছি। আমি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সুযোগ্য কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান, বিপিএম(বার) এর কথা বলছি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ইউনিট প্রধান হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তার ডায়নামিক নেতৃত্বে পাল্টে যেতে থাকে বরিশাল মহানগরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তথা বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ভাবমূর্তি। পেশাদারিত্ব ছাপিয়ে জনমনে পুলিশ হয়ে উঠে মানুষের প্রথম ভরসাস্থল তথা আস্থার মূর্তমান প্রতীক। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশকে একটি জনমুখী, সেবাধর্মী, স্মার্ট, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক সর্বোপরি একটি মানবিক পুলিশ ইউনিট হিসেবে কার্যকর করার জন্য যোগদানের পর থেকেই তিনি বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

যার ফলশ্রুতিতে আমূল বদলে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তথা বরিশাল মহানগর পুলিশের ভাবমূর্তি। সরকারি-বেসরকারি যেকোন সেক্টরে, বিশেষ করে সেবা খাতে সেবার মান নিশ্চিত করার পূর্ব শর্ত হলো, সেবাদাতার কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। পুলিশিং সেবা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়া সত্ত্বেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়েছেন বিভিন্ন সাহসী পদক্ষেপ। একটু বুঝিয়ে বলছি, সাদা কাপড়ে কোন দাগ লাগলে সেটা যেমন খুব সহজেই মানুষের চোখে পড়ে, স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তেমনি পুলিশি সেবায় পান থেকে চুন খসলে সাথে সাথেই পুলিশের উপর মানুষের বিরূপ ধারণা চলে আসে। ধরুন, পুলিশের সংস্পর্শে কোন সমস্যা নিয়ে যদি দুজন ব্যক্তি বা দুটো পক্ষ আইনি সেবা পেতে আসেন। সে সময় পুলিশ যদি শতভাগ ন্যায়ের পক্ষে থেকে আইনানুগ ভাবে সেবা প্রাপ্য ব্যক্তি বা পক্ষকে সেবা প্রদান করেন; সেক্ষেত্রে অপর পক্ষ পুলিশের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান! এভাবেই পুলিশের সংস্পর্শে আসা সকল মানুষের মধ্যে ৫০ শতাংশ মানুষ পুলিশের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবের কাছে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়।

আবার, মহামান্য আদালতে সম্মানিত বিচারকগণ কোন মামলার রায় প্রদানের জন্য কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ করে, উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বা যে কোন নির্দিষ্ট সময়ের পর মামলার রায় ঘোষণা করেন। এক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করে রায় প্রদানের জন্য মহামান্য বিচারকের কাছে যথেষ্ট উপাদান ও সময় থাকে। কিন্তু পুলিশ এমন অনেক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যখন তাকে দুই থেকে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে বিচারকের ন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে সময় স্বল্পতার জন্য, যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না থাকার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ কখনো কখনো সঠিক নাও হতে পারে! তখনই পুলিশের উপর মানুষের বিরূপ ধারণা চলে আসে। এদেশের অনেক মা-বোনরা এখনো তার ছোট শিশুকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, খাবার খাওয়ায়। এতে করে শিশুর মস্তিষ্কে ছোটবেলায়ই পুলিশ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা বাসা বাঁধে। এমন অজগ্র উদাহরণ দেওয়া যায় কিন্তু উদাহরণ দিয়ে সময় নষ্ট করাটা সমীচীন হবে না। এতগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো পুলিশিং কার্যক্রম এতটা স্পর্শ কাতর পেশা হওয়া সত্ত্বেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশনার বরিশাল মহানগরীর সকল থানায় “ওপেন হাউজ ডে” কার্যক্রম চালু করেন।

যেখানে স্বয়ং ইউনিট প্রধান এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ থানার সকল অফিসার ফোর্স এর উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার সকল শ্রেণী-পেশার লোকজন ও ভুক্তভোগীরা উপস্থিত হয়ে তাদের যে কোন সমস্যা, এমনকি তা যদি হয় কোন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সেটাও বলতে পারেন। ওপেন হাউজ ডে তে ভুক্তভোগীদের উত্থাপিত সমস্যা সংক্রান্তে কী কী কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা পরবর্তী ওপেন হাউজ ডে তে জনগণের সামনে জবাবদিহিতা করা হয়। দেশের আর কোন কোন সেক্টর ইউনিট প্রধানের উপস্থিতিতে জনগণের তথা ভুক্তভোগির সামনে বসে এভাবে তাদের কার্যক্রমের জবাবদিহিতা করে সেটা আপনারাই ভাল জানেন? পুলিশের কাছ থেকে কোন সাধারণ জনগণ বা ভুক্তভোগী যেন কোনো হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করেছেন অভিযোগ বক্স। যেখানে ভুক্তভোগীরা চাইলে তাদের যেকোন সমস্যার কথা কিংবা যে কোন অসঙ্গতির কথা গোপনেই জানাতে পারেন।

জনগণের দোরগোড়ায় পুলিশিসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, ওয়ার্ডে-ইউনিয়নে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, ইমাম-পুরোহিত, নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ, জনপ্রতিনিধিসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে শক্তিশালী ও কার্যকরী কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন করে প্রতিটি কমিটিতে একজন করে থানা থেকে অফিসার নিয়োগ করা হয়। মাসে অন্তত একবার প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে কমিউনিটি পুলিশিং সভার আয়োজন করা হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যাতে ভুল করে অপরাধের পথে পা না বাড়ায়, পথভ্রান্ত না হয়, বিভ্রান্ত না হয় সেজন্য থানা থেকে অফিসার পাঠিয়ে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করার জন্য কাউন্সেলিং করার ব্যবস্থা নেন।