প্রবল স্রোত ও নাব্যতা সংকট; শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ঘাট চার ফেরি দিয়ে সচল

মো. মানিক মিয়া, লৌহজং প্রতিনিধিঃ পদ্মায় প্রবল স্রোত ও নাব্যতা সংকটের কারণে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। চারটি ফেরি দিয়ে সচল রাখতে হয়েছে এ রুটের যান চলাচল। চাহিদার চেয়ে ফেরি চলাচল কম থাকায় ঘাটের দুপাড়ে আটকা পড়েছে শত শত যানবাহন। এ কারণে যাত্রী ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি মালবাহী বেশ কিছু ট্রাকচালক গত ১০ দিনেও পার হতে পারেননি এ ফেরিঘাট দিয়ে।

এদিকে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প নৌপথ হিসেবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মীরা। তবে সেটা চালকরা আমলে নিচ্ছে না বলে জানান ঘাট কর্তৃপক্ষ।

বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়া ফেরিঘাট সূত্র জানায়, গত ১৮-২০ দিন ধরে পদ্মা নদী দিয়ে উত্তরাঅঞ্চলের পানি সাগরের দিকে যাচ্ছে। নদীতে বিপদ সীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে প্রচুর পরিমাণ পলি ও ময়লা আবর্জনা ভেসে আসছে। পলি দিয়ে ফেরি চলাচলের পথ ভরাট হয়ে নাব্যতা সংকট তৈরি হয়েছে। ড্রেজিং করেও পথ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নদীতে তীব্র ঘূর্ণি স্রোত তৈরি হয়েছে। স্রোতের বিপরীতে চলতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি সময় লাগছে। দুর্ঘটনা এড়াতে প্রায় সময় ফেরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গত ১২-১৩ দিন ধরে এ কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ঘাট এলাকায় প্রতিদিন যানবাহন জটলা বাঁধছে।

বৃহস্পতিবার সরজমিনে গিয়ে শিমুলিয়া ফেরিঘাটে দেখা যায়, চারটি ঘাটের সংযোগ সড়কে সারি ধরে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে যানবাহনগুলো। টার্মিনালগুলোও যানবাহনে ভরা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পণ্যবাহী ট্রাকের চালকেরা। ব্যক্তিগত যানবাহন ও যাত্রীবাহী বাসগুলোও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রয়েছে। আর প্রতিটি ঘাটের পাশেই নোঙর করে রাখা হয়েছে ফেরিগুলো।

বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শাফায়াত আহমেদ জানান, নদীতে প্রবল স্রোত ও ময়লা আবর্জনা ভেসে আসায় ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ৯টি ফেরি বন্ধ রেখে শক্তিশালী ৪টি ফেরি দিয়ে পারাপার করা হচ্ছে যানবাহন। প্রতিদিনই ঘাটে যানবাহন আটকা পড়ছে।

সরেজমিনে শিমুলিয়া ঘাটের পার্কিং ইয়ার্ডে দেখা যায় পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি। চালকরা তাদের গাড়ি নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারাপারের অপেক্ষায় আছেন। ঢাকা থেকে শিমুলিয়া ঘাটে এসে তাদের মধ্য কেউ ৭ দিন, কেউ ১০ দিন, কেউবা ১৫ দিন ধরে পারাপারের জন্য আটকে আছেন।

খুলনাগামী মাছ ও পশুখাদ্যবাহী ট্রাকচালক হৃদয় হাওলাদার জানান, গত ১৫ জুলাই ঢাকা থেকে শিমুলিয়া ঘাটে এসেছি। কবে যেতে পারবো জানি না। প্রতিদিন সহকারীসহ তাদের দুজনের খাওয়া খরচ ৬০০-৭০০টাকা। আপডাউন ৩ হাজার টাকায় ভাড়ায় এসেছি। সহকারীর খাওয়া ও মজুরি আমার মধ্যে। ফেরি ছাড়ার অনিশ্চয়তা দেখে সহকারীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। লোহার রড বোঝাই করা পটুয়াখালীগামী ট্রাকচালক মিজানুর রহমান বলেন, আমি ঘাটে এসেছি ১৩ জুলাই। স্রোতের কারণে প্রতিদিন মাত্র ৪-৫টি ফেরি চলছে। এভাবে চলতে থাকলে কোরবানির ঈদেও ঘাটেই থাকতে হবে।

তিনি আরও জানান, সব খরচ বাদ দিয়ে ভাড়ার ১০% কমিশন আমার। এখন দেখছি আমি যা পাবো, এ ঘাটেই খাওয়া দাওয়ায় সব খরচ হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারিনি। তাই স্ত্রী বলেছে, ট্রাক না চালিয়ে রিকশা চালাও, তাহলে প্রতিদিনের পয়সা প্রতিদিন পাবে। অথচ ঘাটে আটকে না থাকলে এত দিনে আরও কয়েকটি ট্রিপ দিতে পারতাম এবং বেশ টাকাও কামাতে পারতাম। অপর রডবাহী চালক কুয়াকাটাগামী আল আমিন বলেন, এভাবে মালামাল লোড করা গাড়ি দিনের দিন আটকে থাকলে গাড়ির ক্ষতি হয়।

শিমুলিয়া ঘাটের ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মো. হিলাল উদ্দিন সন্ধ্যায় জানান, ঘাটে সাড়ে পাঁচ শতাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় আছে। শিবচর ঘাটেও প্রায় একই অবস্থা। এর মধ্যে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা আড়াইশর উপরে। ১০-১২ দিনের উপরে ঘাটে অপেক্ষা করছে এমন ট্রাকও আছে। তাদেরকে অপেক্ষায় না থেকে বারবার বিকল্প পথ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব ট্রাক অতিরিক্ত মালবহন করে এ ঘাটে এসেছে। তাই অন্য পথেও যাচ্ছে না।

শিমুলিয়া ফেরিঘাটের উপ মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তীব্র স্রোত ও নাব্যতা সংকটের কারণে স্বাভাবিকভাবে ফেরি চালাতে পারছে না। ঘাট সচল রাখতে মাত্র চারটি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করছি। চলাচলরত ফেরিগুলোও দুই থেকে তিন গুণ বেশি সময় নিয়ে পদ্মা পার হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকে ফেরি পারাপার বন্ধ থাকে। ঘাটে আটকে থাকা যানবাহনগুলোকে এক সপ্তাহ ধরে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। তাঁরা তা শুনছেন না।