পাঁচবার বিয়ে করেও শেষ জীবনে একা থাকতে হয়, অন্ত্যেষ্টি হয় দানের টাকায়

কয়েক দশক আগেও মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে বলিউডের হিন্দি সিনেমা ছিল ব্রাত্য। হিন্দি ছবির গানের পরিচয় ছিল ‘লারে লাপ্পা’। ওই গানের প্রবেশ বাড়িতে বন্ধ করার জন্য ‘চিত্রহার’ বা ‘সুপারহিট মুকাবিলা’ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু জানেন কি, এই ‘লারে লাপ্পা’ গান কিন্তু বলিউডে সত্যিই ছিল। যাঁর উপর চিত্রায়িত হয়েছিল এই গান, বিস্মৃত সেই নায়িকার জীবনের বেশির ভাগ অংশই কেটেছিল নিদারুণ দারিদ্রে।

বক্স অফিসে ঝড় তোলা সিনেমা ‘এক থি লড়কি’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪৯ সালে। এই ছবির নায়িকা ছিলেন মীনা শোরে। তাঁর লিপেই বিখ্যাত হয়েছিল লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ‘লারা লাপ্পা, লারা লাপ্পা’ গান। মীনাও অবশ্য নায়িকার প্রকৃত নাম নয়। জন্মগত নাম ছিল খুরশিদ জাহান। খুরশিদের জন্ম ১৯২১ সালের ১৭ নভেম্বর। অবিভক্ত ভারতের পঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডিতে। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
চরম অনটনের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যেত। শেষে তিন সন্তানের হাত ধরে খুরশিদের মা চলে আসেন তৎকালীন বম্বে শহরে। বিয়ের পরে সেখানেই থাকতেন খুরশিদের বড় দিদি ওয়াজির বেগম। তাঁর কাছেই থাকতে এলেন খুরশিদরা তিন ভাইবোন এবং তাঁদের মা।

বম্বে শহরে একদিন জামাইবাবুর সঙ্গে ছবির মহরৎ দেখতে গেলেন খুরশিদ। ছবির নাম ছিল ‘সিকন্দর’। সুন্দরী খুরশিদকে পছন্দ হয় পরিচালক সোহরাব মোদীর। তিনি তাঁকে ওই ছবিতেই অভিনয়ের সুযোগ দেন। ছবিতে তক্ষশীলার রাজার বোনের ছোট ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন খুরশিদ ওরফে মীনা। তাঁর নতুন নামকরণ করেছিলেন পরিচালক মোদী। সেই নামই রয়ে যায় তাঁর পরিচয় হিসেবে।
১৯৪১ সালে মু্ক্তি পায় ‘সিকন্দর’।নায়কের ভূমিকায় ছিলেন পৃথ্বীরাজ কপূর। দেশ জুড়ে এই ছবি সফল হয়। প্রশংসিত হয় মীনার অভিনয়ও। এরপর তিনি পরিচালক মোদীর সঙ্গে পরপর বেশ কিছু ছবিতে কাজ করেন। সেগুলি হল ‘ফির মিলেঙ্গে’, ‘পৃথ্বী বল্লভ’ এবং ‘পাত্থরোঁ কা সওদাগর’।
মীনার সঙ্গে চুক্তি করেন পরিচালক মোদী। ঠিক হয়, তিনি মোদীর ছবি ছাড়া অন্য কোথাও অভিনয় করতে পারবেন না। কিন্তু এর ফলে বেশ কিছু ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় মীনার। যেগুলি পরে বক্স অফিসে বেশ সফল হয়। শেষে ওই চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মীনা। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন মোদীর স্ত্রী মেহতাব। তিনি স্বামীর সঙ্গে কথা বলে চুক্তি ভাঙার জরিমানার টাকা কমিয়ে দেন।
১৯৪৮ সালে মুক্তি পায় পঞ্জাবি ভাষার ছবি ‘চমন’। পরিচালক ছিলেন রূপ শোরে। পারিবারিক ব্যবসা মন্দার জেরে তিনি লাহৌর ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন বম্বে শহরে। স্ত্রীর সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তিনি ছবিটি তৈরি করেছিলেন। মুক্তির পরে সুপারহিট হয়েছিল ছবিটি এবং এর গান। ছবিতে নায়িকা ছিলেন মীনা।
রূপ শোরের প্রযোজনা ও পরিচালনাতেই ১৯৪৯ সালে মুক্তি পায় ‘এক থি লড়কি’। লতার গাওয়া ট্রেন্ডসেটার ‘লারা লাপ্পা লারা লাপ্পা লায়ি রাখড়ি’ গানে লিপ দিয়ে মীনার নামই হয়ে যায় ‘লারা লাপ্পা গার্ল’। ছবিটি বলিউডে রূপের পায়ের তলায় জমি শক্ত করে। তিনি হয়ে যান বলিউডের প্রথম সারির কমেডি ছবি পরিচালক।
এরপর রূপ শোরের সঙ্গে বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মীনা। সেগুলির মধ্যে অন্যতম ‘ঢোলক’ এবং ‘এক দো তিন’। পাশাপাশি অন্য ব্যানারে কাজের মধ্যে মীনার ফিল্মোগ্রাফিতে উল্লেখযোগ্য হল ‘সহারা’, ‘ভাই জান’, ‘আনমোল রতন’ এবং ‘আগ কা দরিয়া’। ভারতে মুক্তি পাওয়া মীনার শেষ দু’টি ছবি হল ‘শ্রীমতী ৪২০’ এবং ‘চন্দু’। জীবনের এর পরের অংশ মীনা কাটিয়েছিলেন পাকিস্তানে।
মীনার বিয়ে কবে হয়েছিল, তা নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে তাঁর সমসাময়িক ফিল্মি পত্রিকা থেকে জানা যায়, মীনার প্রথম স্বামী ছিলেন অভিনেতা-প্রযোজক-পরিচালক জহুর রাজা। তাঁদের আলাপ হয় ‘সিকন্দর’ ছবির সময়ে। তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে মীনা বিয়ে করেন সহঅভিনেতা আল নাসিরকে। চারের দশকের মাঝামাঝি সে বিয়ে ভেঙে যায়। আল নাসির এরপর বিয়ে করেন সে সময়ের আর এক অভিনেত্রী বীণাকে।
মীনার দীর্ঘতম দাম্পত্য ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়েতে। দীর্ঘ পরিচয়ের পরে তিনি রূপ শোরেকে গ্রহণ করেছিলেন স্বামী হিসেবে। প্রায় আট বছর স্থায়ী হয়েছিল তাঁদের সংসার। তবে কাজের জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার পরে ভেঙে যায় তাঁদের দাম্পত্য। মীনা ওখানেই থেকে যান। রূপ ফিরে আসেন ভারতে।
পাকিস্তানের আমন্ত্রণে রূপ-মীনা গিয়েছিলেন সেখানে। তাঁদের অভিনীত ছবি ‘মিস ১৯৬৫’ মুক্তি পেয়েছিল পাকিস্তানে। যদিও ছবিটি যথেষ্ট বিতর্কিত। অভিযোগ, এই ছবিটির বিষয় গুরু দত্তের ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ৫৫’ থেকে চুরি করা।
অভিযোগ ও বিতর্ককে দূরে সরিয়ে পাকিস্তানেও প্রথম দিকে সফল জীবন কাটাতে সক্ষম হয়েছিলেন মীনা। তিনি ছিলেন প্রথম পাকিস্তানি অভিনেত্রী, যিনি ‘লাক্স’ সাবানের মডেল হয়েছিলেন। তাঁকে বলা হত পাকিস্তানের ‘লাক্স লেডি’। পাকিস্তানেও মু্ক্তি পেয়েছিল মীনার বেশ কিছু ছবি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সরফরোশ’, ‘মিস ৫৬’, ‘বড়া আদমি’, ‘আখরি নিশান’, ‘গুলশন’-এর মতো ছবি।
পাকিস্তানে আরও দু’বার বিয়ে করেছিলেন মীনা। প্রথমে রাজা মীর, তারপরে বিয়ে করেছিলেন পাকিস্তানি সহঅভিনেতা আসাদ বোখারিকে। কিন্তু নিজের ‘শোরে’ পদবী আর পরিবর্তন করেননি। তাঁর রঙিন জীবনের শেষটা ছিল মর্মান্তিক। সাতের দশকে তাঁর দিন কাটতে শুরু করে চরম অর্থকষ্টে। তার থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেননি তিনি।
দারিদ্রের মধ্যেই শেষ হয় একসময়ের গ্ল্যামারাস নায়িকা মীনার নশ্বর জীবন। ১৯৮৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। তাঁর অন্ত্যেষ্টির জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছিল। দান করা অর্থ যোগাড় করেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল ‘লারা লাপ্পা গার্ল’কে।