নেত্রকোণায় চিরকুমার ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে পরিচয়ে ভাতিজির ভাতা উত্তোলন

 জাহাঙ্গীর আলম, নেত্রকোণা প্রতিনিধিঃ নেত্রকোণার মদন উপজেলায় চিরকুমার ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের ভুয়া পরিচয়ে ভাতা, বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক ও মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত এই অভিযোগ দায়ের করেন উপজেলার প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাদিস উদ্দিন দুলাল। অভিযোগ থেকে জানা যায়, মদন উপজেলার মাঘান ইউনিয়নের জঙ্গলডেমারগাতি গ্রামের মৃত আওলাদ হোসেন চৌধুরী ওরফে ভিক্ষু চৌধুরীর সন্তান জহিরুল হোসেন চৌধুরী ওরফে মতিন চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন (গেজেট নং-২৪১৪)।

পরবর্তী সময়ে তিনি অবিবাহিত ও নিঃসন্তান থাকা অবস্থায় মারা যান। কিন্তু উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক এক কমান্ডার, স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালিন মাঘান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হাবীবুর রহমান হবুর জোগসাজশে জহিরুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই মিলন চৌধুরীর মেয়ে তানিয়া শারমিন তন্বীকে জহিরুল হক চৌধুরীর মেয়ে পরিচয় দিয়ে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয়। সেই নিবন্ধন মুলে ২০১৩ সালে তানিয়া শারমিন তন্বিকে কোন প্রকার তদন্তছাড়াই জমাকৃত অর্থ উত্তোলনের ছাড়পত্র ও নতুন ব্যাংক হিসেব খোলার অনুমতি দেয় প্রশাসন। এরপর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত ভুয়া পরিচয়ে মাসিক ভাতা, উৎসব ভাতা, বোনাসসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে আসছে তানিয়া শরমিন তন্বি। যা সম্পূর্ণরুপে মুক্তিযোদ্ধা পুষ্য আইনের পরিপন্থি।

এঘটনা জানাজানি হওয়ায় ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সাথে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে এধরনের ঘটনার দ্রুত তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান। অভিযোগকারী মদন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাক্তন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা হাদিস উদ্দিন দুলাল বলেন, কয়েকজন দুর্ণীতিবাজ ও অসৎ মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও তৎকালীন কিছু কর্মকর্তার জোগসাজশে রাষ্ট্রের সাথে এই প্রতারনা করা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে জহিরুল হক চৌধুরীকে চিনি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। উনি অবিবাহিত ছিলেন। কিন্তু চিরকুমার এই মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর যখন তার ব্যাংক হিসেব বন্ধ করে দেয়ার কথা তখন ভাতা, বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা নেয়ার জন্যে যারা ভাতিজিকে মেয়ে পরিচয় দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত ভাতা উত্তোলনসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই প্রতারক চক্রের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দাবী করছি। মদন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশুজ্জামান খান বলেন, চিরকুমার ছিলেন জহিরুল হক চৌধুরী এবং তিনি চিরকুমার অবস্থাতেই ইহলোক ত্যাগ করেন। কিন্তু তার ভাতিজিকে তার সন্তান পরিচয়ে ভাতা, বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা নেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার প্রতারণা করা হয়েছে। প্রতারণা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে, রাষ্ট্রের সাথে। এতে করে মানক্ষুন্ন হয়েছে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের। আমি এই অপরাধের জড়িত সকলের যোগ্য বিচার প্রত্যাশা করছি।

নেত্রকোণা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আমীন বলেন, আমি যতটুকু জানি একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা না থাকলে তার অবর্তমানে অন্যকারো সে ভাতা উত্তোলনের সুযোগ নেই। এব্যাপারে জন্মনিবন্ধন প্রদানকারী মাঘান ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হাবীবুর রহমান হবুর সাথে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, জহিরুল হক চৌধুরী চিরকুমার ছিলেন কিন্তু আমি তা জানতাম না। এই পরিবারটি এলাকার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি পরিবার। এমন স্মনামধন্য পরিবারের লোকজন আমার কাছে মিথ্যে বলে নিবন্ধন করিয়ে নিয়েছে এটা আমি নিবন্ধন দেয়ার কয়েকদিন পর জানতে পারি। উক্ত বিষয়ে অভিযুক্ত তানিয়া শরমিন তন্বির সাথে কথা বলা সম্ভব না হলেও তার বাবা মিলন চৌধুরী, জহিরুল হক চৌধুরীকে নিজ ভাই ও তানিয়া শারমিন তন্বিকে নিজ কন্যা স্বীকার করে মোবাইলে বলেন, আমি আমার মেয়েকে আমার প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের মেয়ে হিসেবে এফিডেভিট করে দিয়েছিলাম। সে হিসেবেই সে ভাতাদি উত্তোলন করছে।

তাছাড়া দুলাল কমান্ডারের সাথে কথা হয়েছে, তিনি বলেছেন অভিযোগ উঠিয়ে নিবেন। এব্যাপারে মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগটি পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।