নাটোরের হালতি বিল ভ্রমন পিপাসুদের “মিনি কক্সবাজার”

সাজেদুর রহমান, নাটোর প্রতিনিধিঃ নাটোরের হালতিবিল এখন ভ্রমন পিপাসুদের কাছে ‘মিনি কক্সবাজার’ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে। দেশের বৃহত্তম বিল হিসেবে পরিচিত চলনবিল ছাড়াও নাটোরে রয়েছে হালতি বিল। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার একপ্রান্তে প্রায় ৪০ হাজার একর বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে এর অবস্থান।

এটা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার ভ্রমণ পিয়াসি মানুষদের আকর্ষনের অন্যতম স্থান। ব্রিটিশ আমলে এই বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে বিরল প্রজাতির হালতি পাখি বসতো বলেই এর নামকরণ করা হয়েছিল হালতি বিল। তখন ব্রিটিশ সরকারের লোকজন এই বিলে আসতেন সেই হালতি পাখি শিকারে। আর দীর্ঘদিন পরে আবার এখন সবাই আসেন এই বিলের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগ করতে।

বর্ষার এই সময়টা এলেই মন ছুটে চলে, নাটোরের কক্সবাজার খ্যাত বিলহালতির বুকে। যে দিকে চোখ যায় শুধুই অথৈ জলরাশি। চোখ মেললে দেখা যায়, সাপের ফোনার মত ঢেউ, আর ঢেউ ভেঙ্গে ছুটে চলে শ্যালো চালিত নৌকাগুলো। মাঝে মাঝে দিগন্ত রেখায় সবুজের কারুকাজ। চারদিকে অথৈই পানি এই পানির উপরে চরের মতো ভাসছে কিছু গ্রাম।

গড়ে উঠেছে স্কুল, মাদ্রাসা। গ্রামের চারদিকে খড়ের গাদা এমন অপরুপ দৃশ্য কার না ভালো লাগে। নাটোর শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে এ বিলের অবস্থান। হালতিবিলকে দেশের সবচেয়ে গভীর বিল বলা হয়ে থাকে। প্রায় বার মিটার গভীর এই বিলে, প্রায় সারা বছরই পানি থাকে। বর্ষায় পানির পরিমাণ বেড়ে হয়ে যায় অনেক বেশি। শুকনো মৌসুমে বিলের আয়তন কমে গেলেও তা প্রান ফিরে পায় বর্ষা মৌসুমে। এই ঈদকে কেন্দ্র করে, প্রতিদিন সকাল থেকেই আসতে থাকেন দর্শনার্থীরা।

সব বয়েসের মানুষই আসেন এ বিলের দৃশ্য উপভোগ করতে। দর্শনের অন্যতম স্থান পাটুল ঘাট থেকে হালতিবিলের মধ্যে দিয়ে খাজুরা পযর্ন্ত নির্মিত সড়কটি। এই সড়কটির বড় বৈশিষ্ট্য হল,শুকনো মৌসুমে এর উপর দিয়ে সবধরনের যানবাহন চলাচল করে,এবং বর্ষা মৌসুমে সড়কটি ডুবে যায়। তবে যাতায়াতের জন্য সব সময় থাকে সাধারণ ও শ্যালো চালিত নৌকাগুলো। বর্ষার শুরুতে ও শেষে সড়কের দুধারে পানি থাকলেও সড়ক দিয়ে চলাচল করা যায়, নিজস্ব গাড়ী থাকলে এ দৃশ্য উপভোগ করা আরও সহজ হয়ে ওঠে।

আর রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সমুদ্র সৈকতের আমেজ পাওয়া যায়। দুপাশে পানি থাকায় মাঝে মাঝে ছোট বড় ঢেউ আছড়ে পরে। বিলের পশ্চিম দিকে মাধনগর থেকে নলডাঙ্গা পযর্ন্ত রেল লাইন জুড়ে ও পূর্ব মাধনগর থেকে হালতির সড়কে জমে পর্যটকদের উপচে পরা ভিড় জমে। কেউ কেউ দল বেঁধে আবার অনেকে পরিবার নিয়ে নৌকায় চেপে ভেসে চলেন বিলের মধ্যে। নাটোর অঞ্চলের মানুষের ভ্রমনের এমন সুযোগ আগে আর মেলেনি।

দর্শনাথীরা অন্যান্য জেলা গুলো থেকে আসেন সৌন্দর্য উপভোগ করতে। মাটির উপর জল, আর জলের উপর ঢেউ এই নিয়ে বসবাস হালতি বিলাঞ্চলের জনগণের। বর্ষায় এই বিলে চোখ মেললে দেখা যাবে হালতি, নুরিয়াগাছা, খোলাবাড়িয়াসহ অন্য গ্রাম যেন এক একটি ভাসমান দ্বীপ। বিলাঞ্চন দেশের উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনাময় অথচ বিপন্ন জনপদ। বর্ষায় এই জনপদকে কুলহীন সাগরের মত দেখায়। অন্য দিকে শীতে হয়ে উঠে দিগন্ত সবুজ প্রান্তর যেখানে দোল খায় সোনালী ধানের শীষ। তখন এসব জনপদের দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়।

বর্ষায় বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে বিলে প্রবেশ করে। বর্ষায় বিলে প্রকৃতি হয়ে উঠে ভয়াবহ উত্তাল। সামান্য বাতাসে বিলে প্রচন্ড ঢেউ উঠে, বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোর উপর। বর্ষার সময় মাছের নিরাপদ আশ্রয় স্থল হিসাবে বিবেচনা করা হয় এই বিলকে। নাটোর শহরের জিরো পয়েন্ট মাদ্রাসা মোড় হতে গণভবন হয়ে মাত্র ৮ কি.মি.উত্তরে, অটো বা সিএনজিতে ভাড়া মাত্র ২৫-৩০ টাকা। নলডাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে ৫ কি. মি. পূর্বে অবস্থিত এই বিল।

ভাড়া মাত্র ১৫-২০ টাকা। পাটুল থেকে নৌকা ভাড়া জনপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা। এলাকার জনগণ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল দীর্ঘদিন হলো এই এলাকায় পর্যটন নগরী গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০১৭ সালে এই হালতিবিলকে পর্যটন স্পট ঘোষণা করে স্থানীয় এমপি ও প্রশাসন।

সম্প্রতি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান,নলডাঙ্গা থানার জনপ্রতিনিধি ও নৌকা চালক সমিতির প্রতিনিধিদের এক আলোচনা সভায় পাটুল ঘাটের নৌকা মাঝিদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করে নৌকা চলাচল বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার।