নরসিংদীতে নিখোঁজের দুই বছর পর কান্তা হত্যার রহস্য উৎঘাটন

আমজাদ হোসেন, নরসিংদী প্রতিনিধি: নিখোজের দীর্ঘ দু-বছর পর নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বীর বাঘবের গ্রামের সোরাব হোসেন রতনের মেয়ে ও আশুলিয়ার কান্তা বিউটি পার্লালের মালিক মার্জিয়া আক্তার কান্তার নির্মম হত্যা রহস্য উৎঘাটন করলো নরসিংদীর পিবিআই।

এ ব্যাপারে গত ০৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘটনার বিরনদেন নরসিংদী পিবিআই এর পুলিশ সুপার মোঃ এনায়েত হোসেন মান্নান। এসময় তার সাথে ছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান ও পিবিআইয়ের কর্মকর্তা কর্মচারী বৃন্দ।

জানা যায়, মার্জিয়া আক্তার কান্তা আশুলিয়ায় একটি বিউটি পার্লার চালানোর সুবাদে পরিচয় হয় কুড়ি গ্রামের রৌমারী উপজেলার শহীদুল ইসলাম সাগরের সাথে। পরবর্তীতে দুই লক্ষ টাকা কাবিনের বিনিময়ে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কান্তা জানতে পরে সাগর একজন প্রতারক এবং তার একাধিক স্ত্রী আছে যা নিয়ে তাদের বিরোধ হয়।

পরে স্বামী তার মন জয় করার লক্ষে সুকৌশলে তাকে ভারতে ঘুরতে নিয়ে যাবে বলে বুঝায় এবং এ সুবাদে ভারতে সে পার্লারের মালামাল ও কিনতে পারবে। কান্তা তাতে রাজি হলে স্বামী তাকে নরসিংদী বেলাব থেকে আশুলিয়ার জামগড়স্থ বাসায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে প্রস্তুতি নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় তারা।

তার পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তার স্বামী তাকে প্রথমে শরীয়ত পুরে নিয়ে যায়। সেখানে সাগর তার সহযোগী ও কিলিং মিশনের সদস্য মোঃ মামুন মিয়া (২৬) কে পূর্বেই কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে ডেকে আনে শরীয়ত পুরে এবং তারা শরীয়তপুরে নুর ইন্টারনেশনাল হোটেলে উঠে।

তারা কান্তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে শরীয়ত পুরের নড়িয়ায় নদী ভাঙ্গনের দেখাতে নিয়ে যায় কিন্তু দিনের বেলা থাকায় এবং সাগরের সহযোগী মামুন হোটেলে তাদের সঠিক নাম বুকিং দেওয়ায় হত্যা সংঘঠিত করতে পারেনি।

পরে কান্তাকে নিয়ে কুয়াকাটা সমদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ ইং সকালে কান্তাকে নিয়ে সাগর ও মামুন কুয়াকাটা হোটেল আল মদিনার দোতলায় বি-১ নং রুমে উঠে । তারা সারাদিন ,রাত ও পরদিন সকাল ১২ টা পর্যন্ত সৈকতে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে কান্তা যখন হোটেলের বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিল তখনই হোটেল রুমে তার স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগর ও সহযোগী মামুন কান্তাকে গলাটিপে নির্মম ভাবে হত্যা করে।

পরে আসামীদ্বয় ভিকটিম কান্তার মরদেহ পলিথিনে পেচিয়ে হোটেলের বক্স খাটের চালি উঠিয়ে লাশ রেখে পুনরায় চালি বসিয়ে বিচানা করে পালিয়ে আসে। আসামীদ্বয় পটুয়াখালীর আমতলী থেকে দোতলা লঞ্চে সদর ঘাটে আসার পথে কান্তার দুটি মোবাইল ও আসামীদ্বয়ের দুটি মোবাইল নদীতে ফেলে দেয়। এছাড়া কান্তার শরীরে থাকা একটি স্বর্নে চেইন ও চারটি আংটি তারা ভাগভাটোয়ারা করে নিয়ে যায়।

ঘটনার পরদিন হোটেল কর্তৃপক্ষ কক্ষটি তালা বদ্ধ দেখে এবং বোর্ডাদের খোজ না পেয়ে স্থানীয় মহিপুর থানা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে কান্তা ও তার স্বামীর ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় ও একটি চাপাটি জব্দ করে থানায় নিয়ে গেলেও খাটের বক্সে রক্ষিত লাশ তাদের দৃষ্টিতে আসেনি। দু-দিন পর হোটেল বয় সাইফুল (১৫) রুম পরিস্কার করতে গিয়ে গন্ধ পেয়ে বক্স খাটের চালির ফাঁক দিয়ে লাশ দেখতে পেয়ে ম্যানেজার আমির হোসেন(৩৭) ও মালিক দেলোয়ারকে(৪৪) বিষয়টি জানায়।

পরবর্তীতে মালিক দেলোয়র হোসেন ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন(৩৭) ম্যানেজার আমির হোসেন (৩৭)ও বয় সাইফুল(১৫) চারজন মিলে হত্যার আলামত নষ্ট করে লাশ গুমের সিদান্ত নেয়। পরিকল্পনা মোতাবেক পর দিন রাত ১১টার দিকে লাশটি বস্তায় বরে একটি মোটর সাইকেলে করে দেলোয়ার ও আনোয়ার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুর চর এলাকায় নিয়ে যায়।

সেখানে তারা গলা সমান পানিতে লাশ সাগরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে হোটেলে ফিরে আসে। পরবর্তীতে এ ব্যাপার নিয়ে আর কোথাও তারা মুখ খুলেনি। ঘটনার এক বছর পর ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারী ভিকটিম কান্তার বাবা সোরাব হোসেন রতন বাদী হয়ে নরসিংদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবোনাল আদালতে অভিযুক্ত স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগর ও তার পরিবারের ৫ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা করে লাশ ঘুমের মামলা দায়ের করে।

আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নরসিংদীর বেলাব থানায় এজাহার ভুক্ত করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে পিবিআই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব গ্রহন করে । অভিযুক্ত স্বামী সাগরকে গ্রেফতারের পর শুরু হয় তদন্তের অগ্রগতি।

এরপর এ বছর ১ সেপ্টেম্বরে অপর খুনি মামাতো ভাই মামুন পিবিআইয়ে জারে ধরা পড়লে তদন্তে আরো গতি পায়। মামুনকে নিয়ে পিবিআই কুয়াকাটা আল-মদিনা হোটেলে গেলে আল-মদিনার মালিক দেলোয়ার,ছোট ভাই আনোয়ার,ম্যানেজার আমির হোসেন ও হোটেল বয় সাইফুল কান্তার লাশ গুমের কতা স্বীকার করলে তাদের চারজনকে গ্রেফতার করে নরসিংদীতে নিয়ে আসে পিবিআই দল আদালতে সোপর্দ করে।