ঢামেকের গাফিলতিতেই নষ্ট কিডনির সঙ্গে ভালোটাও অপসারণ

অকেজো কিডনি অপারেশনের সময় ভালো কিডনি কেটে নেওয়ায় রোগীর মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দেরিতে দেওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি।

বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটির সঙ্গে ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের সদস্যদের বৈঠকের পর এ তথ্য জানানো হয়। থানার তদারকি না থাকায় রিপোর্ট দিতে দেরি হয়েছে বলে দাবি করে ফরেনসিক বিভাগ। তবে গাফিলতির বিষয়টি অস্বীকার করে ফরেনসিক বিভাগ বলছে, লোকবল সংকটসহ নানা কারণে রিপোর্ট দিতে দেরি হয়েছে।

একটির বদলে দুটি কিডনি কেটে ফেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনায় গত ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন মৃত রওশন আরার ছেলে রফিক সিকদার। মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোলোজি বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, ডা. আল মামুন, ডা. ফারুক ও ডা. মোস্তফা কামালকে অভিযুক্ত করা হয়।

গত ২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রওশান আরা নামে এক রোগীর বাম পাশের কিডনি অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে ডান পাশের কিডনিও ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তার ছেলে রফিক সিকদার। মৃত রওশন আরার ময়নাতদন্ত হয় একই বছরের ৩ নভেম্বর।

ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ তখন জানান, মৃতদেহের শরীরে কোনো কিডনি পাওয়া যায়নি।

কিন্তু রিপোর্ট দিতে গড়িমসি করে ঢামেক হাসপাতালের ফরেসসিক বিভাগ।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্ত কমিটির সদস্যরা ২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন সংক্রান্ত বিষয় জানাতে সংবাদ সম্মেলন করে।

সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির প্রধান ও জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, তদন্তে এ ঘটনা আমাদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাই এ ধরনের কেস রির্পোট আমরা ইন্টারনেটে দেখতে চেয়েছি। কিন্তু সেখানে দেখা গেছে, এ ধরনের কোনো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। আমরা সব ইনভেস্টিগেশন দেখেছি। তার (রওশন আরা) প্রথম আলট্রাসনোগ্রামে দুটি কিডনিই ছিল। তবে সেখানে একটি কিডনি স্বাভাবিক থাকলেও আরেকটি কিডনি ফোলা ছিল। আবার সিটি স্ক্যান রিপোর্টে পাওয়া যায়, তার দুটি কিডনি থাকলেও একটি হাইড্রো নেফ্রোটিক, অন্যটি অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। যেহেতু কিডনির ফাংশন স্বাভাবিক ছিল, সে হিসেবে আমরা আশা করেছিলাম, একটি কিডনি অস্ত্রোপচার করলে রোগী সুস্থ থাকবেন।

অধ্যাপক হারুন অর রশীদ আরও বলেন, এ রোগী ইনফেকটেড ছিলেন। আগে দুই বার তার কিডনি অস্ত্রোপচার হয়েছে। তাই কিডনিটা ইনফেকটেড ছিল। অস্ত্রোপচার টেবিলে তার রক্তক্ষরণ শুরু হয়, পুঁজ বেরিয়েছিল। তখন ইনফেকশন শরীরে ছড়িয়ে যায়। সে অবস্থায় রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য জীবন বাঁচানোটাই মুখ্য হয়ে যায়। রওশন আরার দুটি কিডনি থাকলেও কিডনির নিচের দিকটা কানেকটেড ছিল, যেটাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় হর্ষসু (ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতি) কিডনি বলা হয়। কিন্তু এটি আলট্রাসনোগ্রাম ও সিটি স্ক্যানে ধরা পড়েনি।

ডা. হারুন বলেন, যিনি অস্ত্রোপচার করেছিলেন, সে মুহূর্তে রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য, রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য, পুঁজ রিমুভ করার জন্য হয়তো বাম কিডনির সঙ্গে ডান কিডনি চলে এসেছে। তখন অ্যাকুইট কিডনি ফেইলিউর হয়, যেটা অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক বুঝতে পেরেছেন কি না, আমি জানি না। পরে ইনফেকশন শরীরে ও মস্তিষ্কে ছড়িয়ে যায়, যাকে বলা হয় Disseminated intravascular coagulation (DIC)। পরে ব্রেইন স্ট্রোক হয়, একইসঙ্গে ডিআইসির মারাত্মক জটিলতা দেখা দিলে তার মৃত্যু হয়। কিডনি ফেইলিউর হয়ে রোগী মারা যান বলে আমি বিশ্বাস করি না।

দুঃখ প্রকাশ করে ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও রোগী মারা গেছেন। এ জন্য আমরা দুঃখিত, মর্মাহত। এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য চিকিৎসকদের আরও বেশি সর্তক হওয়া উচিত। কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক থাকা সত্ত্বেও মেডিকেল সায়েন্সে এমন কিছু ঘটে যায়, যেটার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।

তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আমানুর রসুল বলেন, আমাদের দেখার বিষয় ছিল বাম পাশের কিডনি ফেলা হয়েছে কি না। আমরা বলেছি, ফেলা হয়েছে। একইসঙ্গে ডান পাশের কিডনিও অপসারিত হয়েছে বলে স্বীকার করেন এ অধ্যাপক।

ডান পাশের কিডনি অপসারণ স্বাভাবিক কি না— জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের ডা. আমানুর রসুল বলেন, জন্মগতভাবে তার ‘হর্স শু’ কিডনি ছিল। অস্ত্রোপচার কক্ষে তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সার্জনের উদ্দেশ্য ছিল, তার জীবন বাঁচানো, কোনো অর্গান (অঙ্গ) বাঁচানো নয়। প্রচুর রক্তক্ষরণ, আগের অস্ত্রোপচার এবং অন্যান্য অ্যাডিশনের কারণে সেটা কিডনি কি না— সেটা বোঝা অসম্ভব ছিল। ওই সময় সার্জন যেটা করেছেন, সেটা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।

তদন্ত কমিটিতে আরও ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম খুরশিদুল আলম, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. জুলফিকার রহমান খান, নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আছিয়া খানম, রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইকবাল হোসেন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আমানুর রসুল।