ঝুঁকি নিয়ে মাঠে দায়িত্বপালন করছেন শেরপুরের সাংবাদিকরা

নিজের চেয়ে পরিবার বড়, দায়িত্বে থাকলে পরিবারের চেয়ে দেশ বড়! এই কথাটি বার বার আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোন না কোন ইস্যু। এবারও তার উল্টো হলো না। ঠিকই মনে করিয়ে দিলো নভেল করোনা ভাইরাস। দেশের নানা ক্রান্তিলগ্নে জীবন ঝুঁকি নিয়ে মাঠ দাপিয়ে দায়িত্বপালন করেছেন সাংবাদিকরা। মহামারি করোনার দাপটে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব প্রায় অচল। এ অবস্থায় সারাদেশের ন্যায় নিরলসভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন শেরপুরের সাংবাদিকরা। শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়; জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সাথে সমন্বয় করে জনসচেতনতা তৈরি, খাদ্য সামগ্রী বিতরণসহ শেরপুরকে করোনা মুক্ত রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

করোনা উপসর্গে মৃত্যুর খবর, নমুনা সংগ্রহ ও সনাক্তের খবর, করোনা আক্রান্তের পরিবারের প্রেক্ষাপটসহ জেলায় করোনার সার্বিক পরিস্থিতির খবর সংগ্রহ করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন শেরপুর জেলার কর্মরত সাংবাদিকরা। দৈনিক খবর, পত্রিকার ফিচার, টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদন আবার কখনো লাইভে দাঁড়াতে হচ্ছে তাদের। এমনকি জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সাথে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবেও কাজ করছেন তারা। পেশাগত দায়িত্বসহ এসব কাজ করতে গিয়ে পরিবার ছেড়ে আলাদা বাসায় থাকতে হচ্ছে অনেককেই।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন ও পুলিশের সাথে অনেকেই সাংবাদিকদের সামনের সারির যোদ্ধা বলে মনে করছেন। পেশার তাগিদে, খবর সংগ্রহের নেশায় সাংবাদিকরা অনেক সময়ই করোনা আক্রান্তের সংস্পর্শে চলে আসছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের করোনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। এদিকে জেলা প্রশাসনের করোনা ইমার্জিন্সি সাপোর্ট টিম ও জেলা পুলিশের করোনা ইমার্জিন্সি রেসপন্স টিমের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে শেরপুর প্রেসক্লাব, শেরপুর ইয়্যুথ রিপোর্টার্স ক্লাবসহ অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠন।

এছাড়া জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাজার সদাই ও ইফতার বাজার নামের দুটি ই-কমার্স পরিচালনা করছেন সাংবাদিকরা। পাশাপাশি বিএমএ ও জেলা পুলিশের সহযোগিতায় শেরপুরের মানুষদের মুঠোফোনে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার লক্ষে চালু করা হয়েছে শেরপুর টাইমস টেলিমেডিসিন সেবা। এতে প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এক ঘন্টা করে চিকিৎসা পরামর্শ দিচ্ছেন সাধারণ মানুষদের। স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মিমোজা এন্টারপ্রাইজের পৃষ্ঠপোষকতায় এই টেলিমেডিসিন সেবা থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০/৩০জন সেবা নিচ্ছেন।

শেরপুরে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ, জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ নানা কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। এ কর্মযজ্ঞের খবর দেশের মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তবে, তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা। পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিতে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ব্যবস্থা নেবে বলে হাইকোর্ট অভিমত ব্যক্ত করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো পর্যন্ত কোন ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে করোনা পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন অবস্থায় এখন গণমাধ্যমকর্মীরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।

করোনা ইমার্জিন্সি রেসপন্স টিমের সহ-সমন্বয়ক চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক ইমরান হাসান রাব্বী বলেন, শেরপুরটা আমাদের, তাই শেরপুরকে ভালো রাখতে হবে আমাদেরই। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে যদি আমরা না এগিয়ে আসি, তাহলে মহামারী করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আমরা টিকে থাকতে পারবো না। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসতে হচ্ছে। তাই দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারের সাথে বাসায় থাকা হচ্ছে না, আলাদা বাসায় থাকতে হচ্ছে।

মানুষকে সচেতন করতে মাঠে কাজ করছে সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবী ফোরাম নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের আহবায়ক শেরপুর প্রতিদিনের সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, মানবিক বিষয় বিচেনা করেও আমাদের এই সময় কাজ করতে হচ্ছে। যদিও নিরাপত্তাসামগ্রী আমাদের খুবই সীমিত, এরপরও জেলার মানুষকে সচেতন করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।

শেরপুর টাইমস টেলিমেডিসিনের উদ্যোক্তা এসএ টিভির সাংবাদিক মহিউদ্দিন সোহেল বলেন, করোনা আতঙ্কে অনেকেই হাসপাতালে যাচ্ছে না এজন্য আমাদের এ উদ্যোগ। এতে অনেক মানুষ খুব উপকৃত হয়েছেন। আমরা চেষ্টা করছি এই উদ্যোগটি করোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অব্যহত থাকবে। আমাদের এই উদ্যোগে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) শেরপুর জেলা শাখা।

এ ব্যপারে শেরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি শরিফুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে পিপিইসহ সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এমন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকর্মীদের বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা, মাঠ পর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকারীদের বিশেষ বীমার আওতায় আনা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানিয়েছেন তিনি।