চৌদ্দগ্রামে করোনা মহামারীতে অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্র্যাকের সেবা অব্যাহত

কামাল হোসেন নয়ন, কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম প্রতিনিধি:  কিস্তির টাকা না নিয়ে উল্টো ঋণ দিচ্ছে # পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক মাইকিং # সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন # জনবহুল স্থানে সামাজিক দূরত্ব ম্যাপ অঙ্কন করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভুমিকা পালন করছে এনজিও সংস্থা ‘ব্র্যাক’।

শুরু থেকেই ব্র্যাকের চৌদ্দগ্রাম ও গুনবতী এরিয়া অফিসের সকল শাখার উদ্যোগে প্রত্যকটি গ্রাম এবং পাড়া-মহল্লায় মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্টিকার লাগানো, লিফলেট বিতরণ, হাট-বাজার ও রাস্তার মোড়ে হাত ধোয়ার জন্য সাবান পানির ব্যবস্থাকরণ, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিভিন্ন জনবহুল স্থানে সামাজিক দূরত্ব ম্যাপ অঙ্কনসহ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচি, সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি, শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে অতি দরিদ্র পরিবারকে নগদে এবং বিকাশের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা প্রদানসহ নানাবিধ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

এছাড়াও ব্র্যাকের মাইগ্রেশান প্রকল্পের উদ্যোগে বিদেশ ফেরতদের বিভিন্ন অঙ্কের টাকা প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক। জানা গেছে, যুদ্ধ বিধ্যস্ত সর্বহারা মানুষদের ত্রাণ ও পূণর্বাসন কার্যক্রম দিয়ে ১৯৭২ সালে এনজিও ব্র্যাকের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের যে কোন দুর্যোগ মুহুর্তে সরকারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সর্ব প্রথম এগিয়ে আসে স্যার ফজলে হাসান আবেদ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক। সম্প্রতি করোনার ভয়ে সারাদেশের মানুষ যখন আতঙ্কিত তখন ব্র্যাকের কর্মীরা সাধারণ ছুটি এবং ঈদের ছুটিকে উপেক্ষা করে, পরিবারের মায়া ত্যাগ করে সদস্যদেরকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে।

ফোন পেয়ে অনেক সদস্য আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছে। ব্র্যাক অফিস থেকে ফোন দিয়ে এলাকার মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থবিধি মেনে চলা এবং করোনার লঙ্কণ প্রকাশ পেলে সরকারি হটলাইন নম্বর ৩৩৩ এবং ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এনজিও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অনেক মানুষের নেতিবাচক ধারণা থাকলেও ব্র্যাকের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চৌদ্দগ্রাম, গুণবতী, মুন্সিরহাট, কাশিনগর, চিওড়া, চৌধুরী বাজার ও কাদৈর বাজার শাখার এই সকল ব্যতিক্রম উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শনকালে চৌদ্দগ্রাম ব্র্যাক অফিসে ঋণ নিতে আসা রহিমা আক্তার জানান, ‘আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় আড়াই মাস ঘর থেকে বের হতে পারেনি। আয় করতে না পারায় কিস্তিও পরিশোধ করতে পারেনি।

ব্র্যাকের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্যার আমাকে ফোন দিয়ে হাতে টাকা পয়সা আছে কিনা এবং ঘরে খাবার আছে কি না-সে ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছেন। সংসার পরিচালনায় কষ্টের কথা শুনে স্যার আমার সঞ্চয়ের টাকা বিকাশের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছেন। স্বামী ছোট ব্যবসা করবে তাই ঋণ নিতে এসেছি। বিপদের দিনে ব্র্যাক যে উপকার করেছে, আমার আত্মীয় স্বজনরাও তা করেনি। কিস্তি আদায়ের ব্যাপারে ব্র্যাকের চৌদ্দগ্রাম দাবি প্রকল্পের এলাকা ব্যবস্থাপক মোঃ আবদুর রউফ মিয়া ও ব্র্যাক গুনবতী দাবি প্রকল্পের এলাকা ব্যবস্থাপক মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক কিস্তির টাকা কালেকশন বন্ধ রেখেছি। তবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ঋণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছি।

সদস্যদের চাহিদা মোতাবেক বিকাশের মাধ্যমে সঞ্চয় ফেরত দিচ্ছি। যে সকল সদস্যদের আর্থিক অবস্থা ভালো এবং কিস্তি দিতে আগ্রহী তারা বিকাশের মাধ্যমে কিস্তি প্রদান করেছেন। দেশের এই পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা খুবই প্রয়োজন। তাই আমরা সদস্যদেরকে অফিসিয়াল বিকাশের মাধ্যমে লেনদেনে উৎসাহ প্রদান করি। এ প্রসঙ্গে চৌদ্দগ্রাম ব্র্যাক এরিয়া অফিস ও গুনবতী ব্র্যাক এরিয়ার সকল অফিস এর সকল শাখার দাবি প্রকল্পের ব্যবস্থাপকদের পক্ষে মোঃ জিয়ারুল ইসলাম বলেন, সদস্যদের প্রয়োজনকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কিস্তি আদায় আমাদের মুখ্য বিষয় নয়। সদস্যরা আবার কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে সেটা নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। তবে বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরা গর্বিত।

চৌদ্দগ্রাম ব্র্যাকের প্রগতি প্রকেল্পর এলাকা ব্যবস্থাপক আল মামুন খাঁন এবং উপজেলা হিসাব ব্যবস্থাপক মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, অফিসে নিয়মিত জীবানুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। সেবা নিতে আসা সদস্যদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে, মাস্ক পরে এবং হাত ধুয়ে অফিসে প্রবেশ করতে হয়। সামাজিক দূরত্ব যাতে বিঘ্নিত না হয় সে ব্যাপারে আমাদের কাস্টমার সার্ভিস টিম যথেষ্ট সচেতনতা পালন করছে। ব্র্যাকের কুমিল্লা-২ অঞ্চলের দাবি প্রকল্পের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোঃ মহসিন চৌধুরী বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, বিভাগীয় ব্যবস্থাপক রাজেশ কুমার সাহা(দাবি) ও মারুফ আহমেদ(প্রগতি) নেতৃত্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

গত ২৬ মার্চ থেকে করোনা ভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ তাদের আয় রোজগারের পথ হারিয়ে ফেলেছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের মূলধন খেয়ে ফেলেছেন। এমতাবস্থায় ঋণের বকেয়া থাকা স্বত্ত্বেও কিভাবে নতুন করে রিফাইন্যান্স করে সদস্যদের আয় রোজগারের পথকে সচল রাখা যায়-সে ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। সু-স্পষ্ট গাইডলাইন পেলে সে অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম আবার নতুন করে শুরু করবো, ইনশাআল্লাহ। তবে তিনি জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি এবং সরকারি সব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করারও পরামর্শ দেন। ।