চাঁদপুরে ৩ দিন ব্যাপী নজরুল সম্মেলনের উদ্বোধন

মোহাম্মদ বিপ্লব সরকার, চাঁদপুর জেলা: কবি নজরুল ইনস্টিটিউট সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নজরুলের অপ্রচলিত গানের সুর সংগ্রহ, সরলিপি প্রণয়ন, সংরক্ষন, প্রচার ও নবীন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধকরণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৪ মার্চ থেকে চাঁদপুর জেলায় ৩ দিন ব্যাপী জাতীয় নজরুল সম্মেলন শুরু হয়েছে।

গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গন থেকে শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত বণার্ঢ্য র‌্যালির নেতৃত্ব দেন প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে নজরুল সম্মেলনের উদ্বোধনীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি বলেন আমরা আজকে নজরুল ও জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করছি। কবি নজরুল জাতীয় কবি, সাম্যের কবি ও দেশের কবি ছিলেন। জাতির পিতা দেশের মানুষ ও দেশকে ভালো বেসেছেন। ধর্মে ধর্মে বিদ্বেষ তা দূর করতে চেয়েছেন।

কবি নজরুল যত বিদ্বেষ ও ক্লেশ দেখেছেন তার বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু নজরুলের ভক্ত ছিলেন। তিনি নিজে নিজে নজরুলের কবিতা আবৃতি করতেন এবং নজরুল সংগীতের সাথে ঠোট মিলাতেন। স্বাধীনতার মহাকাব্যের কবি ছিলেন তিনি।

নজরুল যে কোন বৈষম্যের জন্য প্রতিবাদ করেছেন লিখনীর মাধ্যমে। সেজন্য তিনি জেলে খেটেছেন। অসুস্থতা তার লেখনীকে স্তব্ধ করেছেন। জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু নজরুলের লেখনী থেকে নিয়েছেন। স্বাধীনতার ২৯ বছর আগে তিনি যে কথা বলেছেন তাই সত্যি হয়েছে। আমরা নজরুলকে দেখি তার লেখার বৈচিত্র্যে। কাঠ বিরালী নজরুলের লেখা। এখন কাঠ বিড়াল মেয়ে হয়েছে।

হিন্দু মুসলিম বৈষম্য ও ধর্ম নিয়ে হানাহানি। তিনি লেখনীতে প্রকাশ করে বৈষম্য দূর করেছেন। আমাদের মধ্যে ধর্মান্ধতা দূর করতে হবে। নজরুলের লেখনীতে এত ছন্দ, আরবি শব্দ যেন মিলন। তার প্রেমের কবিতা এতটা মধুর ছিল যে কেউ পড়তে পারত।

তিনি গান লিখেছেন মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই। তার মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি তিনি শুনতে পান। বাংলাদেশ যতদিন থাকবেন কবি নজরুল মিশে থাকবেন।

নজরুল চাঁদপুরে এসেছেন। রাত্রি যাপন করেছেন। সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাছির উদ্দিনের সাথে তার সখ্যতা ছিল বেশ। নজরুল পানের বাটা সামনে নিয়ে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। নাছির উদ্দিন বলেছেন নজরুলকে তার পত্রিকায় লেখা দেওয়ার জন্য। নজরুলের মনে পড়ে যাওয়ায় সিড়ির কাছে দাঁড়িয়ে একটি লেখা লিখে নাছির উদ্দিনের সাথে দেখা করেন। নজুলের জন্ম জয়ন্তীর আর আড়াই মাস বাকি রয়েছে। আমরা সাবই মিলে চেষ্টা করলে চাঁদপুরে নজরুলেরস্মৃতি চিন তৈরি করতে পারব।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, কবি নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালে ধুমকেতু পত্রিকার মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। মাটির মুর্তি কবিতা লেখার পর তাকে হাজতবাস খাটতে হয়েছে। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিে জাগ্রত করে। ১৯৪১ সালে কবি নজরুলের কথায় বলেন এদেশের মানুষ লাঠি দিয়ে দেশ স্বাধীন করে রেখেছিল। ১৯৪১ সালে নজরুলের সান্নিধ্যে এসেছেন বঙ্গবন্ধু। আর তখনই বন্ধুবন্ধুকে নজরুলকে কাছে থেকে দেখেন।

১৯৫৫ সালে জাতির জনকে উদ্যোগে নজরুলের জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। সেই থেকে দুজনের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু কলকাতায় এসেছেন। একবিংশ শতাব্দীর চেতনায় গড়ে উঠতে পারি সেজন্য নজরুলের আদর্শে আমাদের সকলকে গড়ে উঠতে হবে। জাতীয় কবি ও নজরুলকে স্মরণ করতে গেলে বঙ্গবন্ধুকেও স্মরণ করতে হবে। আমাদেরকে স্বাধীনতার কথা বলতে গেলে নজরুলকে স্মরণ করতে হবে। স্বাধীনতার জন্য কবি নজরুলের অবদান রয়েছে অনেক। বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা কাজী নজরুল ইসলামকে কিভাবে জান। তিনি মুসলমান কিংবা হিন্দুর কবি নয়। তিনি বাংলার বিদ্রোহী কবি। দেশের জন্য তিনি বলেছেন ধর্ম দিয়ে মানুষের বিচার কর না।

মৌলবাদ, উগ্রবাদ যেখানেই দেখেছেন নজরুল লিখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন। কেউ হয়েছেন বিশ্ব কবি, কেউ আবার বিদ্রোহী কবি। নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী কবি। দেশেরজন্য বিদ্রোহ করেছেনবলেই তাকেজ বিদ্রোহী কবি বলা হয়। কবি নজরুল শ্যামা সংগীত লিখেছেন। আবার তিনি হামদ নাথ ও লিখেছেন।

জেলা প্রশাসক মোঃ মাজেদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে ও ডাঃ পীযুষ কান্তি বড়–য়ার সঞ্চালনায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্য রাখেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মোঃআব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া। সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন শিশু সাহিত্যিক ও সাবেক সচিব মোঃ ফারুক হোসেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, আলোচক হিসেবে থাকবেন সদ্য অবসর গ্রহণ করা চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এস.এম দেলোয়ার হোসেন, সাহিত্য একাডেমির মহাপরিচালক কাজী শাহাদাত, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধঅরণ সম্পাদক এ.এইচ.এম আহসান উল্লাহ, স্বাগত বক্তব্য রাখবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটটের সচিব ও প্রকল্প পরিচালক মোঃ আব্দুর রহিম।

বিকেল ৪টায় নজরুল জীবন পরিক্রমা তথ্য চিত্র প্রদর্শনী, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কবিতা পাঠ করবেন শিশু সাহিত্যিক ফারুক হোসেন, সংগীত পরিবেশন করবেন করিম হাসান খান, সুলতানা শরমিন জাহান, বিজন চন্দ্র মিশ্রি, আয়েশা আক্তার, মজিবুর রহমান প্রধানীয়া ও স্থানীয় শিল্পীগণ। নৃত্য পরিবেশন করবে ওয়ার্ড দ্যা রিহ্যাব নির্দেশিত নৃত্য দল ও স্থানীয় শিল্পীবৃন্দ। উদ্বোধনীয় অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে র‌্যালির উদ্বোধনের পূর্বে পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি। এ সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করে।