ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা

 মোঃ রাশেদ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার রাতে ঘূর্ণিঝড়টি যখন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন দুই কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যা দেশের মোট গ্রাহকের প্রায় ৬০ শতাংশ। ঝড়ের তীব্রতা কমার পর বৃহস্পতিবার ভোর থেকে দুর্গত এলাকায় সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করে বিতরণ সংস্থাগুলো। তবে দুপুর পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় এক তৃতীয়াংশের বেশি। এর মধ্যে গ্রিড সাব স্টেশনে আগুন লাগায় কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎহীনতার কবলে পড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিডিনিউজ বলেন, “ভোলা, বরগুনা, বরিশাল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় গাছ পড়ে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, পোল ভেঙে পড়েছে। “বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ৬০ শতাংশে রিকভার করা গেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ৯০ ভাগ এলাকা রিকভার করা যাবে।” দেশে ছয়টি বিতরণ সংস্থার অধীনে রয়েছে তিন কোটি ৬৫ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক। তার মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহকের সংযোগ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত বন্ধ বা বিচ্ছিন্ন থাকায় চাহিদা ১০ হাজার মেগাওয়াট থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় সচল এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের ভোল্টেজ বেড়ে যায়।

ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে আরও অনেক এলাকায় সরবরাহ বন্ধ রাখা হয় বলে বিতরণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার এই বিপর্যয়ের মধ্যে অনেক উৎপাদনকেন্দ্রও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোর ৫টায় সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২ হাজার ৬৮৩ মেগাওয়াটে নেমে আসে। দিনের প্রথমাংশে কিছু সংযোগ পুনস্থাপন করা হলেও বেলা ১টা পর্যন্ত চাহিদা সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াটের ওপরে উঠেনি। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত মার্চের শেষ দিকে সারাদেশে অবরুদ্ধ করার সময় বিদ্যুতের চাহিদা নেমেছিল সর্বনিম্ন ছয় হাজার মেগাওয়াটে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে হতে চাহিদা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উঠে। সারাদেশে পল্লী বিদ্যুতের মোট গ্রাহক সংখ্যা দুই কোটি ৮৫ লাখ। তার মধ্যে প্রায় দুই কোটির সংযোগ সকালের দিকে বন্ধ ছিল জানিয়ে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অনজন কান্তি দাশ বলেন, দুপুর পর্যন্ত এক কোটি গ্রাহকের বিদ্যুৎ ফেরানো সম্ভব হয়েছে। “২৫ হাজার স্পটে তার ছিঁড়ে পড়েছে। তিনশর মতো খুঁটি ভাঙার খবর পেয়েছি, সংখ্যাটা আরও বাড়ছে।

প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের মিটার ভেঙে গেছে।” কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, যশোর, পটুয়াখালী জেলা পুরোপুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে জানিয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, সেখানে বিদ্যুৎ ফিরতে সময় লাগবে বলে তাদের মনে হচ্ছে। তবে ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, পিরোজপুর জেলায় বিদ্যুৎ ফিরেছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) জনসংযোগ শাখার পরিচালক এবিএম বদরুদ্দোজা সুমন বলেন, কুষ্টিয়া ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাব স্টেশনে আগুন লেগে দুটি ট্রান্সফরমার জ্বলে গেছে। ফলে কুষ্টিয়াসহ পাশের কয়েকটি জেলায় দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে।

“তবে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলায় কোনো সমস্যা হয়নি। সেখানে বিতরণ সংস্থাগুলো লোড কমিয়ে দেওয়ার কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তারা যখনই চাইবেন বিদ্যুৎ পাবেন।” এ বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কুষ্টিয়াতে রিকভার করতে আরও ২/৩ দিন সময় লাগবে। তবে আমরা চেষ্টা করছি সাবস্টেশন ঠিক করার আগেই সেখানে জরুরি মুহূর্তের কাজ চালানোর মতো বিদ্যুৎ দিতে। কুষ্টিয়ায় এখনই বড় আকারের বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।”