উদ্বেগ- উৎকন্ঠায় গাজীপুরবাসী; করোনা সংক্রামন পোশাক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

আশজাদ রসুল সিরাজী, গাজীপুর প্রতিনিধি: সারাদেশের হিসাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের দিক থেকে গাজীপুরের অবস্থান তৃতীয় স্থানে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গতকাল সোমবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৩৩৬ জন। গত ২০ এপ্রিল এই সংখ্যা ছিলো ২৭৯ জন। এখন পর্যন্ত মারা গেছেন দুই জন। চলতি মাসে এখানে আক্রান্তের হার কমছে।

তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে করোনাভাইরাস পোশাক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া ২৫ জন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ৯৯ জন ও ৯১ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। গাজীপুর মহানগরীর গাছা ও টঙ্গী এলাকার দুইটি পোশাক কারাখানার দুই শ্রমিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের একজন শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং অপরজন টঙ্গী গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এই দুই পোশাক শ্রমিককে আলাদা করে করে চিহ্নিত করা গেলেও আগে থেকে স্বাস্থ্য বিভাগ পোশাক শ্রমিকদের আলাদা করে চিহ্নিত করেনি। তবে এখন পোশাক শ্রমিকদের আলাদা করতে শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় ১৩০ জনের নমুনা পাঠানো হয় পরীক্ষার জন্য। সেখানে তিন জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। সেই হিসাবে এখন গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩৬ জন। এর মধ্যে গাজীপুর সদর উপজেলায় ১১৮, শ্রীপুর ২৩, কাপাসিয়া ৭০, কালীগঞ্জ ৯১ ও কালিয়াকৈর উপজেলায় ৩৪ জন। এর আগে গত ২০ এপ্রিল গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ২৭৯ জন। গাজীপুরে গত ১১ দিনে ১ হাজার ৩৬৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করে মাত্র ১৯ জনের শরীরে করোনাভাইরাস পজিটিভ পাওয়া গেছে। জেলায় এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

এছাড়া মহানগরীর গাছা ও টঙ্গী এলাকায় দুই জন পোশাক কারখানার শ্রমিক করোনোভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গাজীপুর সিভিল সার্জন মো. খাইরুজ্জামান বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা এখন একটু কম মনে হলেও নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের আরো পর্যবেক্ষনে থাকতে হবে। গাজীপুর থেকে আগেও যে পরিমানে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এখনও সেই পরিমানে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। এখন পোশাক কারখানা খোলেছে তাই আরো সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, দুই জন পোশাক কারখানার শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে তাদের সংক্রামন হয়েছে তাদের গ্রামের বাড়ির এলাকা থেকে। তারা এখন শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার বলেন, আক্রান্ত একজনের বাড়ি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার হরনাথপুর কাদিরাবাদ এলাকায়। তার বয়স (২৮)।

তিনি গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার কেবি বাজার বড়বাড়ি এলাকায় ভাড়া থেকে স্থানীয় পার্ক স্টার এ্যাপারেলস লিমিটেড নামের কারখানায় চাকুরি করেন। অপরজন টঙ্গীর শান্তা এক্সপ্রেশন লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় চাকুরী করেন। তিনি গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পশ্চিম থানার মুদাফা এলাকায় বসবাস করেন। তিনি করোনা ছুটিতে ২০ এপ্রিল গ্রামের বাড়ি যান। পরে সেখান থেকে ১ মে মুদাফা এলাকায় ফিরে তার দেহের নমুনা টঙ্গীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে করোনা পরীক্ষায় করলে করোনা পজেটিভ হয়। আক্রান্ত ওই ব্যক্তি জানান, তিনি করোনার ছুটিতে ২৩ এপ্রিল গ্রামের বাড়ি যান। সেখানে গিয়ে বুক ও গলা জ্বালা পোড়া দেখা দেয়। পরে স্বাস্থ্য কর্মীরা বাসায় গিয়ে করোনা সংক্রমন পরীক্ষার জন্য নমুনা নিয়ে যায়। পরে গ্রামের বাড়ি থেকে ২৮ এপ্রিল গাজীপুরের ফিরে আসি। বুক-গলা জ্বালা-পোড়া নিয়ে আমি একাই গাজীপুরের বাসায় অবস্থান করছিলাম।

তিনি জানান, গাজীপুর থেকে রংপুরে গিয়েই তার দেহে করোনার সংক্রমন লক্ষণ ধরা পড়েছে। গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যানবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত গাজীপুরে ২৫ জন চিকিৎসক, নার্স ২৪ জন ও স্বাস্থ্যকর্মী ৫০ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গাজীপুর মহানগরীর গাছাথানাসহ বিভিন্ন বিভাগের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯১ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত আছেন। পোশাক শ্রমিকদের আলাদা কোন হিসাব রাখায় হয়নি। তবে এখন থেকে সেটিও করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. তপন কুমার সরকার জানান, এই হাসপাতালে এখন ৬ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে। বর্তমানে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি করতে কোন সমস্যা নেই। যারা ভর্তি হওয়ার মতো রোগী তাদের ভর্তি করা হচ্ছে। হাসপাতালে চারটি ভেন্টিলেটর ও ১০ টি আইসোলেশন রয়েছে।

গাজীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য অসীম বিভাকর বলেন, ‘বলা হচ্ছে স্বাস্থ্য বিধি মেনেই গার্মেন্টসগুলি খোলে দেয়া হয়েছে। বাস্তবে গার্মেন্টস শ্রমিক যারা তারা স্বাস্থ্য বিধি বুঝেও না, মানেও না। কারখানার ভিতরেও সেই স্বাস্থ্য বিধি মানা হচ্ছে না। এখন লকডাউনটা আরো ভালো করে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এটির প্রধান ওষুধ হচ্ছে দুরত্ব রক্ষা করা। সেটি মেনে চললে এই অবস্থা থেকে পরিত্রান সম্ভব।’ গাজীপুর জেলা প্রশাসক ও করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপাতি এসএম তরিকুল ইসলাম জানান, দুইজন পোশাক শ্রমিক করোনায় আক্রান্তের খবর পেয়েছি। এটি খুবই চিন্তার বিষয়। ওই শ্রমিকদের করোনা সংক্রমনের প্রকৃত উৎস ও বিস্তরণের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।