আমার অবিশ্বাস্য জীবনচক্র, কবি নির্মলেন্দু গুণ

মামুন কৌশিক, বারহাট্টা উপজেলা প্রতিনিধি: আমি একটা অদ্ভুত মানুষ, অবিশ্বাস্য মানুষ। ঢাকায় আসার পর কিছুকাল তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে, বস্তিতে, পথের পাশে, রেল স্টেশনে, মসজিদে, সাইড লাইনে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত ট্রেনের কামরায় ( কালো মেঘের ভেলা) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের বন্ধুদের রুমে, তাদের রুমের ফ্লোরে পত্রিকা বিছিয়ে থেকেছি।

কাজের মানুষ অকাজের আমাকে তাদের চলার পথে পা-দিয়ে মাড়িয়ে গেছে। আমি রাগ করিনি। কষ্টও পাইনি। সর্বদা মনে মনে ভেবেছি, দাঁড়াও, কবি হয়ে আমি আমার সব দুঃখের অবসান ঘটাবো। আমার জীবনের বিপরীত চিত্র কীভাবে যেন বেশ ক’টি বিশ্বসেরা হোটেলে থাকার সৌভাগ্যও হয়েছে আমার। আমি মস্কৌর ক্রেমলিনের নিকটবর্তী বিশ্বের সবচেয়ে বড় হোটেল বলে কথিত হোটেল মস্কোতে থেকেছি বেশ কিছুদিন, ওখানে থাকা কালেই আমার পরিচয় হয়েছিলো দিল্লির ভিসাম শাহনী, কলকাতার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়,

পাকিস্তানের জবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, দক্ষিণ আফ্রিকার একেক্স লা গুমা, ফলিস্তিনের কবি মঈন বেঁসিসোসহ আরও অনেকের সঙ্গে। আমি সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে গিয়ে থেকেছি সেন্ট পিটার্সবুর্গের হোটেল ইউরোপায়( হিটলার ঐ বিখ্যাত হোটেলে লাঞ্চ করার বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই সাধ পূর্ণ হয়নি।) আমি থেকেছি হোটেল উলিয়ানভস্কে। থেকেছি কাম্পুচিয়ার রাজা প্রিন্স নরোদম সিহানুকের রাজপ্রাসাদে। থেকেছি হ্যানয়ে কিউবার তৈরি করে দেয়া লিবার্টি হোটেলে। আমি থেকেছি লস এঞ্জেলেসের বিখ্যাত বেভারলি হিলস হোটেলে।

থেকেছি নিউইয়র্কের রিজেন্ট হায়াত হোটেলে (মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণসঙ্গী হয়ে)। জাপানের কিয়োটো নগরীতে একটা প্রাচীন হোটেলে থেকেছিলাম। নামটা ভুলে গেছি। হিরোশিমায় কি কারও বাসায় ছিলাম নাকি কোনো হোটেলে ছিলাম, ঠিক মনে করতে পারছি না। লন্ডনে একটা খুব কম-দামী হোটেলে ছিলাম, যার দৈনিক ভাড়া ছিল মাত্র ১৬ পাউন্ড। প্যারিসে কোনো হোটেলে থাকিনি, অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বাসায় থেকেছিলাম। সুইডেনের গুটেনবার্গ ও উপশালায় যে দুটো হোটেলে ছিলাম, নাম ভুলে গেছি। দুবাই নগরীতে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে গিয়ে থেকে ছিলাম একটি খুব ভালো পাঁচতারা হোটেলে। হোটেলের নাম ভুলে গেছি। দিল্লিতে তিনবার থেকেছি হোটেল অশোকায়। একবার ওয়ার্লড হ্যাভিটেট-এ।

দুবার থেকেছি IICC হোটেলে। ভাবি, কবি জীবনের শুরুতে ঢাকার বস্তিতে থাকার সামর্থও যার ছিলো না, সেই লোকের জীবনের সঙ্গে উল্লিখিত বিশ্বসেরা হোটেলের নামগুলি যুক্ত হলো কীভাবে? সত্যিই যুক্ত হয়েছিলো কি? এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটিকে বাংলাদেশের একজন কবির জীবনের সত্য গল্প বলে মানাটা একটু কঠিন এবং অবিশ্বাস্য বলেই তো মনে হয়। আমারই মনে হয়, সে-ই আমিই কি এ-ই আমি? আসলে, সত্য বলতে কী, আমি একজন খুব অবিশ্বাস্য মানুষ। যারা আমাকে বাংলা ভাষার অন্য পাঁচজন সাধারণ কবির একজন বলে ভাববেন, তাদের জীবনে দুঃখের অবধি থাকবে না।